সেদিন দীপুর বাবা সুদে টাকা ধার করেছিলেন আর মা নিজের শেষ সম্বল সোনার বালা দুটি তুলে দিয়েছিলেন ছেলের হাতে, যখন সে শহরের নামী কলেজে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দীপু জানত, ওই টাকার নোটগুলো কেবল কাগজ নয়, ওগুলো তার বাবা-মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি আর বহু রাতের দীর্ঘশ্বাস।
শহরের জীবন দীপুর জন্য সহজ ছিল না। টিউশনি করে যা পেত, তাতে ল্যাবরেটরির ফি আর মেস ভাড়ার পর নিজের খাওয়ার টাকা জুটত না। মাসের শেষ দিনগুলোতে তার সঙ্গী হতো শুধু জল-ভাতা রুটি। বন্ধুদের দামী ল্যাপটপ বা নতুন স্টাইলিশ চশমার ভিড়ে দীপুর পুরনো চশমাটা বড্ড বেমানান দেখাত। ফ্রেম ফেটে গিয়েছিল, আর কাঁচ ঘষতে ঘষতে মাঝখানে কুয়াশার মতো এক ঝাপসা আস্তরণ পড়ে গিয়েছিল।
একদিন ল্যাবে এক জটিল পরীক্ষার সময় সেই অস্পষ্ট কাঁচই কাল হলো। বিকেলের ম্লান আলোয় বুরেটের সূক্ষ্ম রিডিং নিতে গিয়ে দীপু ০.৫ আর ০.৬-এর পার্থক্য করতে পারল না। তার একটি সামান্য ভুলেই পুরো পরীক্ষাটি ব্যর্থ হলো, নষ্ট হলো দামী রাসায়নিক। অধ্যাপক হতাশ হয়ে বললেন, “দীপু, তোমার মেধার ওপর ভরসা ছিল, কিন্তু আজ তুমি আমাকে খুব ছোট করলে।”
সেদিন দীপু প্রতিবাদ করতে পারেনি। সে কি বলবে যে তার মেধার চেয়ে তার দারিদ্র্য আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে? এক জোড়া স্বচ্ছ চশমার কাঁচের অভাবে তার সারা বছরের পরিশ্রম ধুলোয় মিশে গেল। সেদিন সে প্রথম বুঝল, স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে কেবল মেধাই যথেষ্ট নয়, একটি নুন্যতম আর্থিক বর্মের প্রয়োজন হয়।
কলেজ শেষে চাকরি মিলল, কিন্তু অভাবের স্বভাব বড় বিচিত্র। একেকটি দিন যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল। টাকা আসছিল ঠিকই, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা বালির বাঁধের মতো ধসে যাচ্ছিল। একদিকে বাবার পুরনো ঋণ, অন্যদিকে ছোট বোনের বিয়ের খরচ। দীপু বুঝতে পারল সে এক চক্রব্যূহে আটকা পড়েছে। উপার্জনের ভুল ব্যবস্থাপনায় সে রাতে ঘুমোতে পারত না। ভবিষ্যতের চিন্তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
ঠিক এই ক্রান্তিলগ্নে তার জীবনে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হলেন তার সেই পুরনো অধ্যাপক। তিনি দীপুর প্রতিভা চিনতেন। তিনি তাকে একটি গবেষণার কাজে যুক্ত করলেন এবং একই সঙ্গে শেখালেন জীবনের অমূল্য এক পাঠ। আর্থিক শৃঙ্খলা।
অধ্যাপক তাকে বুঝিয়েছিলেন, “জীবনটা কেবল ল্যাবরেটরি নয় দীপু, এটা একটা ব্যালেন্স শিটও বটে। তুমি উপার্জনের অঙ্ক শিখেছ, কিন্তু ব্যবস্থাপনার ব্যাকরণটা শেখোনি।”
দীপু এবার আবেগের চেয়ে যুক্তিতে মন দিল। সে তার ডায়েরিতে প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখতে শুরু করল। বিলাসিতা নয়, বরং আত্মরক্ষার জন্য সে গড়ে তুলল একটি ‘জরুরি তহবিল’ (Emergency Fund)। নিজের বেতন থেকে অল্প অল্প করে সরিয়ে সে প্রথমে বাবার চড়া সুদের ঋণের হাত থেকে পরিবারকে মুক্ত করল। আর্থিক এই নিরাপত্তাই তার মনে সেই হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনল, যা একদিন তার ঝাপসা চশমা কেড়ে নিয়েছিল।
পকেটে যখন সামান্য সঞ্চয় থাকে, তখন মস্তিষ্কে উদ্ভাবনী চিন্তাগুলো ডানা মেলার সাহস পায়। সঞ্চিত অর্থের জোরেই সে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় দামী বই আর উন্নত প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করল।
আজ দীপু একজন প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী। তার সুসজ্জিত ল্যাবরেটরিতে বসে সে যখন মাইক্রোস্কোপে চোখ রাখে, তখন তার ড্রয়ারে সযত্নে রাখা থাকে সেই পুরনো ভাঙা চশমাটা। ওটা তাকে মনে করিয়ে দেয় তার যুদ্ধের কথা।
দীপু এখন বিশ্বাস করে, “অর্থের অভাব মানুষকে পঙ্গু করতে পারে, কিন্তু সঠিক আর্থিক জ্ঞান ও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা মানুষকে সেই পঙ্গুত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে স্বপ্নের শিখরে পৌঁছে দেয়।”
মেধা আর পরিশ্রম থাকলেই হয় না, তাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে প্রয়োজন একটি মজবুত আর্থিক বর্ম। 'অর্থসূত্র'-এর মূল লক্ষ্যই হলো আপনাকে সেই বর্ম তৈরিতে সাহায্য করা। দীপুরের মতো আপনার জীবনের 'ব্যালেন্স শিট' গুছিয়ে নিতে এবং সঠিক সঞ্চয় ও বিনিয়োগের কলাকৌশল জানতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের ব্লগে। মনে রাখবেন, আজকের ছোট সঞ্চয়ই আপনার আগামী দিনের বড় আবিষ্কারের ভিত্তি।
ভাস্কর বসু
মাইকেলনগর, কোলকাতা

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন