![]() |
| ধৈর্য, সময় আর ইনডেক্স - ডলার কাকুর বিনিয়োগ |
ডলার কাকুর এই গ্রামটি সাধারণ কোনো লোকালয় নয়, এ যেন মানচিত্রের বাইরে থাকা এক বর্ধিষ্ণু স্বপ্নপুরী। পাহাড়ের পাদদেশে সযত্নে সাজানো এই জনপদের ঠিক মাথার ওপর অটল গাম্ভীর্যে দাঁড়িয়ে আছে নীলচে পর্বতশ্রেণী। অদূরে সবুজে ঘেরা নিবিড় বনানী আর তারই বুক চিরে নেমে আসা পাহাড়ি ঝর্ণার কলতান নির্জন দুপুরেও এক আশ্চর্য সুরের জাল বুনে রাখে। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে ঠিকই কিন্তু প্রকৃতির স্নিগ্ধতাকে তা কলুষিত করতে পারেনি। গ্রামের মসৃণ পিচঢালা রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ সোলার লাইটগুলো যেন আধুনিকতার প্রদীপ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু গ্রামের আসল রূপটি খোলে হিমেল কুয়াশাঘেরা জোৎস্না রাতে। যখন আকাশের রুপালি চাঁদ আর সোলার লাইটের মৃদু সোনালি আভা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায় তখন চারদিকে এক মায়াময় স্বপ্নীল পরিবেশ তৈরি হয়। মনে হয় যেন কোনো নিপুণ শিল্পী হালকা তুলির টানে ধরণীর বুকে স্বর্গের প্রতিচ্ছবি এঁকে দিয়েছেন। অদূরেই নদীর বিশাল জলাধার যেখানে এককালের চপল নৃত্যরতা পাহাড়ি নদীটি হঠাৎ কোনো অলৌকিক মন্ত্রবলে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। সেই স্থির জলের ওপর যখন চাঁদের আলো এসে পড়ে মনে হয় এক বিশাল রূপালি আয়না আকাশকে বুকে ধরে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে।
এই শান্ত পাহাড়, নিথর নদী আর কুয়াশামাখা আলোর মায়াজালেই ডলার কাকুর বসবাস। জমিদার বাড়ির বারান্দায় বসে যখন তিনি বাইরের দিকে তাকান তখন তাঁর দৃষ্টির স্থিরতা যেন সামনের ওই জলাধারের গভীরতাকেও হার মানায়। তিনি শুধু এই গ্রামেরই অধিবাসী নন তিনি যেন এই প্রকৃতিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যিনি যুগের আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন কিন্তু নিজের শেকড় আর শান্তিময় নিরাভরণ জীবনকে ভুলে যাননি।
ভবানীপ্রসাদ ওরফে ডলার কাকু লোকটা বড় বিচিত্র। তাঁর চরিত্রের পরতে পরতে এমন এক বৈরাগ্যের ছাপ যা দেখলে মনে হয় এই সংসারের কঠিন হিসেব নিকেশের মাঝে থেকেও তিনি যেন কোনো এক সুদূর নির্জনতার যাত্রী। তাঁর চোখেমুখে এক আশ্চর্য প্রশান্তি সব সময় বিরাজ করে যেন কোনো এক নিভৃত তীর্থের গোপন সংবাদ তিনি একাই উদ্ধার করেছেন আর সেই প্রসাদেই তাঁর অন্তর পূর্ণ।
পাহাড়তলীর সেই পুরনো জমিদার বাড়ির কড়িকাঠের কড়কড়ে চাল, নোনা ধরা দেওয়াল আর ধুলোপড়া প্রাচীন বইয়ের পাহাড়ের মাঝে তিনি তাঁর একাকীত্বকে উৎসবের মতো উদযাপন করেন। বিকেলের ম্লান আলোয় যখন তিনি বারান্দার কাঠের দোলনায় বসেন তখন তাঁর দোলার শব্দে যেন সময়ের নাড়ীস্পন্দন শোনা যায়। পরনে তাঁর সাদা ধোপদুরস্ত খদ্দরের পাঞ্জাবি কিন্তু সেই শুভ্রতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক কঠোর নিরাভরণ জীবন। সকালের প্রথম সূর্য যখন পাহাড়ের মাথায় উঁকি দেয় তিনি তখন নিজের হাতে বাগানের করমচা আর তুলসী গাছে জল দেন। মাটির ঘ্রাণ আর পাতার শিহরণে তিনি যে আনন্দ খুঁজে পান তা হয়তো কোনো রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্যেও মেলানো ভার।
আভিজাত্যের সংজ্ঞাকে তিনি যেন নিজের অজান্তেই এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো বংশগত বৈভবের সবটুকু অধিকার যাঁর হাতের মুঠোয় তাঁর মধ্যাহ্নভোজনটি ছিল এক প্রশান্ত বৈরাগ্যের মতো অনাড়ম্বর। সামান্য সুগন্ধি আতপ চালের অন্ন আর দু একটি নিরামিষ ব্যঞ্জনেই তাঁর রসনার তৃপ্তি। বিলাসিতার কোনো উগ্র রুচি তাঁর অন্নগ্রহণের এই শান্ত সমাহিত মুহূর্তটিকে স্পর্শ করতে পারেনি।
অথচ এই নিভৃতচারী মানুষটির অঙ্গুলিহেলনে যে বিপুল অর্থরাশি পর্দার আড়ালে নিঃশব্দে আবর্তিত হয় তা দিয়ে অনায়াসেই হয়তো একটি আস্ত সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে তোলা যেত। প্রাচুর্য সহস্র প্রলোভন নিয়ে বহুবার তাঁর দ্বারে এসে হানা দিয়েছে। ঐশ্বর্য সশব্দে কড়া নেড়েছে তাঁর অন্দরে প্রবেশের আকুলতায়। কিন্তু ভবানীপ্রসাদ তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন অবলীলায়। তিনি সম্পদকে দেখেছেন কেবল এক পবিত্র দায়িত্ব বা আমানত হিসেবে। কোনোকালেই তাকে নিজের আত্মার ওপর বোঝার মতো চেপে বসতে দেননি। উদ্ধত ঐশ্বর্যের চকমকি আলোকে এক বিনম্র উপেক্ষা ভরে দূরে সরিয়ে দিয়ে তিনি বরণ করে নিয়েছেন পাহাড়তলীর এই স্নিগ্ধ ধূলিকণা আর কুয়াশার মায়াবী মিতালি।
তাঁর দিকে তাকালে এক অতীন্দ্রিয় বিভ্রম হয়। মনে হয় মানুষটি হয়তো এই নশ্বর মর্ত্যের ধুলোবালি মেখেই সাধারণ মানুষের মতো পথ হাঁটছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর হৃদয়ের নিগূঢ় কম্পাসটি স্থির হয়ে আছে এমন এক অনিমেষ ধ্রুবতারার দিকে যাকে কোনো পার্থিব ঝড় বা বাজারের সাময়িক উন্মাদনা স্পর্শ করতে পারে না। সেখানে সংসারের যাবতীয় লাভ ক্ষতির জটিল অঙ্কগুলো পাওয়া আর না পাওয়ার অস্থির হিসেবগুলো দিনের শেষে এক পরম শূন্যতায় অথবা এক অতল শান্তিতে এসে বিলীন হয়ে যায়। তিনি যেন এই বিশাল বিশ্বের গতির সাথে নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের ছন্দ মিলিয়ে নেওয়াকেই জীবনের আসল সার্থকতা বলে চিনেছেন। তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠানের জয় পরাজয়ের সংকীর্ণ মায়ায় নিজেকে না বেঁধে তিনি তাঁর সঞ্চয় আর স্বপ্নকে গেঁথে দিয়েছেন একটি জাতির সামগ্রিক জয়যাত্রার সাথে। বাজারের উত্তাল তরঙ্গে যখন সবাই দিশেহারা ডলার কাকুর সেই ধ্রুবতারাটি তখন তাঁকে নিঃশব্দে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় এক প্রশান্ত গন্তব্যের দিকে।
সেদিন বিকেলের সেই অমেয় স্তব্ধতায় যখন পাহাড়ের নীল ছায়াগুলো উপত্যকায় ক্রমশ দীর্ঘতর হয়ে নামছে, কাকু হঠাৎ তাঁর চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে স্থির চোখে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর সেই দৃষ্টিতে কোনো পার্থিব ব্যাকুলতা ছিল না, ছিল এক মহাসমুদ্রের গভীরতা। এক আশ্চর্য উদাসীন কিন্তু স্নেহমাখা কণ্ঠে তিনি বললেন "শোনো অপূর্ব শহরের ইঁদুর দৌড়ের গোলকধাঁধায় ভুল করেও পা দিও না। সবাই সেখানে মাল্টিব্যাগার নামের এক মায়াবী সোনার হরিণের পিছনে হন্যে হয়ে ছুটে মরছে। কিন্তু ওরা জানে না যে মাল্টিব্যাগার কেউ কাউকে থালায় সাজিয়ে দিয়ে যায় না। ওটা সময়ের গর্ভে নিভৃতে জন্মানোর বিষয়। মাটির নিচে বীজ পুঁতলে তা মহীরুহ হতে যেমন মহাকালের ধৈর্য্য লাগে বিনিয়োগও ঠিক তেমনই।"
কাকুর কণ্ঠস্বর তখন যেন কোনো নির্জন বনের উদাসীন বাউলের একতারা হয়ে বেজে উঠল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন "মানুষের বড় অহংকার বাবা! সে ভাবে আগামীর নদীর পথটা সে চিনে ফেলেছে। তার বাঁকগুলো সব তার নখদর্পণে। অথচ ভবিষ্যৎ তো সেই প্রাচীন বনস্পতির মতো, যার কোন জীর্ণ ডালটা কখন ভেঙে পড়বে তা বনের পশুপাখিও জানে না। এই যে আমি সূচক বা ইটিএফ-এর কথা বলি, এ কি স্রেফ কোনো রুক্ষ বিজ্ঞানের অঙ্ক ভেবেছ? না! এ হলো প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম।"
বারান্দার ওপাশে অরণ্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি মৃদু হেসে বললেন "গভীর অরণ্যে তাকিয়ে দেখেছো কখনো? সেখানে কেউ গাছ গুলিকে জল দেয় না, সার দেয় না। সেখানে দুর্বল গাছ নিজেই শুকিয়ে ঝরে পড়ে আর সবল চারা মাটি ফুঁড়ে মাথা চাড়া দিয়ে আকাশ ছুঁতে চায়। ইনডেক্স বা সূচকও ঠিক প্রকৃতির সেই সিলেকশন বা বিবর্তনবাদ মেনে চলে। সে তার ঝুড়ি থেকে পচা আপেলগুলোকে মহাকালের অমোঘ নিয়মে নিজেই ঝেড়ে ফেলে দেয় আর প্রাণশক্তিতে ভরপুর নতুন অঙ্কুরকে জায়গা করে দেয়। তোমাকে আলাদা করে অরণ্য পরিচর্যা করতে হয় না। শুধু অরণ্যের সেই অজেয় শক্তির ওপর ভরসা রাখলেই যথেষ্ট।"
ডলার কাকুর কথাগুলো যখন শেষ হলো মনে হলো এক মরমী সাধকের মুখে জীবনের গূঢ় সত্য শুনলাম। পাহাড়ের ওপর তখন প্রথম তারাটি ফুটে উঠেছে আর কাকুর বারান্দায় বসে মনে হচ্ছিল বিনিয়োগের এই সহজ পাঠ আসলে জীবনেরই এক অন্য নাম।
আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তাঁর সেই প্রশান্ত দুটি চোখের দিকে। সে এক আশ্চর্য দৃষ্টি। অতলস্পর্শী সায়রের মতো গভীর অথচ তাতে কোথাও কোনো মায়ার টান নেই। কোনো এক জীবনজয়ী পথিকের মতো তিনি যেন নিজের যাবতীয় দহন আর সংশয়কে প্রশান্তির এক চাদরে ঢেকে রেখেছেন। সেই স্নিগ্ধ চাউনি দেখে মনে হয় জীবনের সবটুকু ঝাপটা সয়ে নিয়েও কী অবলীলায় হাসা যায়। আসলে হারাবার কোনো ভয় কোনো গুপ্ত উৎকণ্ঠা তাঁকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করে না। কেনই বা করবে? তিনি তো নিজের ওই সীমাবদ্ধ মস্তিস্কের অতি চালাকি বা ক্ষণস্থায়ী বুদ্ধির ওপর বাজি ধরেননি। তিনি তাঁর সবটুকু বিশ্বাস সঁপে দিয়েছেন মহাকালের সেই ধীর অথচ নিশ্চিত গতির চরণে। তিনি চিনেছেন সেই সত্যকে যেখানে নিজের ক্ষুদ্র আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে সময়ের চিরন্তন ছন্দের সঙ্গে পা মেলাতে পারলেই পরম তৃপ্তি পাওয়া যায়। তাঁর এই বৈরাগ্যমাখা স্থিরতা যেন বলতে চায় জগতের চঞ্চল ঢেউগুলো আসুক আর যাক, সমুদ্রের অতল গভীরে যে স্থিরতা আছে তাকে টলাবার সাধ্য কারো নেই।
জোয়ার-ভাটার চক্র
রাত বাড়লে ডলার কাকুর বাড়ির মেজাজটা কেমন যেন এক অলৌকিক রহস্যানুভূতিতে ভরে ওঠে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে যখন রূপালি জোৎস্না গড়িয়ে পড়ে আর অদূরের সেই স্তব্ধ জলাধারটি আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জকে বুকে নিয়ে আয়নার মতো স্থির হয়ে থাকে তখন ডলার কাকুর বাড়ির ওই প্রশস্ত বারান্দায় বসে মনে হয় আমরা এই মাটির পৃথিবীতে নেই, কোনো এক মহাকালের খেয়া নৌকায় চড়ে ভেসে চলেছি অসীমের পানে।
কাকু তাঁর হাতের রূপালি কাজ করা সুপুরি কাটার যাঁতিটি পাশে নামিয়ে রাখলেন। কুয়াশার পাতলা চাদর তখন পাহাড়ের গায়ে। তিনি মৃদু অথচ গম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করলেন তাঁর সেই চিরন্তন অ্যাসেট অ্যালোকেশন-এর মন্ত্র:
"শোনো বাবা, যখন সেই করোনা কালের ছায়া ঘনিয়ে এল চারদিকে যেন শ্মশানের এক নিথর নীরবতা। মানুষ দিশেহারা হয়ে নিজের সবটুকু সম্পদ এমনকি সেই ইনডেক্স বা সূচকটুকুও বিক্রি করে প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছে। আমি সেদিন বারান্দায় বসে ওই পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম প্রকৃতি যেমন ধ্বংসের পরে নতুন সৃজন করে বাজারও ঠিক তাই। মানুষ যখন চরম ভয়ে কুঁকড়ে যায়, মা লক্ষ্মী তখনই আসলে সবচেয়ে সস্তায় ধরা দেন। আমার সঞ্চিত সোনার রত্নভাণ্ডার তখন ছিল এক অভেদ্য ঢাল। আমি নিঃশব্দে সেই সোনায় জমে থাকা সম্পদ বের করে ইনডেক্সের ওই পড়ন্ত ঝুড়িতে ঢেলে দিলাম।"
কাকু একটু থামলেন। দূরে বনের দিক থেকে একটা রাতজাগা পাখির ডাক ভেসে এল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন:
"আবার যখন দেখি চারদিকে হুজুগ উঠেছে, মানুষের পা আর মাটিতে পড়ছে না, যে যেভাবে পারছে ঘটিবাটি বিক্রি করে শেয়ার বাজারে এসে ভিড় জমাচ্ছে, তখন আমি বুঝতে পারি এবার জোয়ারের জল নামার সময় এসেছে। উন্মাদনার সেই তুঙ্গ মুহূর্তে আমি নিঃশব্দে বাজারের সেই চঞ্চল ভিড় থেকে সরে আসি। মুনাফার সেই সম্পদটুকু নিয়ে আমি আবার ফিরে যাই সোনার ওই নিরাপদ আশ্রয়ে। এই যে সোনার ইটিএফ দেখছ ওটা হলো ওই ধ্রুব পাহাড়ের মতো অচল অটল। যখন চারদিকে তুফান ওঠে ওই পাহাড়টাই আমাকে ছায়া দেয় আর যখন তুফান থেমে শান্ত সমুদ্র দেখা দেয় তখন আমি আবার পাল তুলি।"
কাকুর কথাগুলো যখন শেষ হলো রাতের স্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হয়ে এল। বুঝতে পারলাম তাঁর এই সম্পদ ব্যবস্থাপনা স্রেফ কোনো লাভের অঙ্ক নয় বরং এ হলো প্রকৃতির ঋতুচক্রের মতো এক অমোঘ নিয়ম। লাভ ক্ষতির উর্ধ্বে উঠে তিনি আসলে সময়ের সাথে এক অদ্ভুত সখ্যতা পাতিয়েছেন।
ডলার কাকুর ওই শান্ত কণ্ঠস্বরে এক আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তি আছে। তাঁর বাচনভঙ্গিতে এমন এক গভীর পরিমিতিবোধ যা শুনলে মনে হয় কোনো প্রাচীন তপোবনের ঋষি জীবনের গূঢ় রহস্য এক অতি সাধারণ রূপকের আবরণে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তিনি তাঁর এই সঞ্চিত সম্পদকে পরম মমতায় আগলে রাখেন ঠিকই কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো সেই সম্পদের প্রতি তাঁর কোনো মোহ নেই। তিনি যেন সেই নিঃস্বার্থ প্রহরীর মতো যিনি রাজকোষ পাহারা দেন অটল নিষ্ঠায়। সম্পদের এই নিরাসক্ত মালিক হওয়া যে কী কঠিন সাধনা তা ডলার কাকুর ওই দীপ্ত চোখের দিকে না তাকালে বোধহয় বোঝা যায় না। তিনি যেন সেই পদ্মপত্রের ওপরের টলটলে জলবিন্দুটির মতো যিনি বৈভবের ওপর ভেসে থাকেন ঠিকই কিন্তু তাকে কখনো নিজের আত্মায় লিপ্ত হতে দেন না।
তিনি জানেন ব্যক্তিগত কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি সময়ের নিষ্ঠুর ঝাপটায় ধ্বসে পড়তে পারে, ধুলোয় মিশে যেতে পারে তার নাম ও আভিজাত্য। কিন্তু একটি দেশের অগণিত মানুষের মিলিত শ্রম তাদের বেঁচে থাকার অদম্য আকুতি আর সামষ্টিগত অর্থনীতির সেই প্রবহমান ধারা কখনো একদিনে স্তব্ধ হয়ে যায় না। ডলার কাকু মৃদু হেসে একবার ওই আঁধারঘেরা পাহাড়টার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন "ব্যক্তিগত মায়ার এই বাঁধন বড় ক্ষণভঙ্গুর। একক কোনো প্রতিষ্ঠানের জয়গান আসলে বালুকাবেলায় নাম লেখার মতো। জোয়ারের একটি ঢেউই তাকে মুছে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একটা গাছ ভেঙে পড়া মানেই সম্পূর্ণ অরণ্যের বিনাশ নয়। আমি তাই ব্যক্তিগত কোনো নামের পেছনে না ছুটে এই দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন যেখানে মিশে আছে সেই সূচকের ওপর নিজের বিশ্বাস স্থাপন করেছি। একা একজন মানুষ হারতে পারে কিন্তু মানুষের সামষ্টিগত স্বপ্নকে কখনো হারানো যায় না।"
লাভ ক্ষতির ক্ষুদ্র গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি আসলে এক বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছেন। তাঁর এই দর্শনে কোনো ব্যবসায়িক চাতুরি নেই আছে এক গভীর আধ্যাত্মিক স্থিরতা।
মহাকালের ঘড়ি
বাড়ির সেই বিশাল কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো পুরনো পেণ্ডুলাম ঘড়িটায় যখন গম্ভীর স্বরে ঢং ঢং করে রাত দশটার ঘণ্টা বাজল সেই শব্দ যেন নিস্তব্ধ জমিদার বাড়ির প্রতিটি কড়িকাঠে এক প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেল। ডলার কাকু তাঁর রত্নখচিত চশমাটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন এবং এক পরম মমতায় চামড়ায় বাঁধানো সেই জীর্ণ ডায়েরিটা বন্ধ করলেন। বাইরের পাহাড়ি বাতাস তখন জানলার খড়খড়িতে একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ তুলছে।
ডলার কাকু আমার দিকে চেয়ে একটু স্নান হাসলেন তারপর ধীরস্বরে বললেন "একটি কথা আজীবন মনে রেখো অপূর্ব। কেবল সংখ্যাতত্ত্বে বড় হওয়া মানেই কিন্তু সফল হওয়া নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো সেই অতিমানবিক ক্ষমতা যা থাকলে বাইরের দুর্যোগে পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেলেও ঝড়ের রাতে নিজের বালিশে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমানো যায়। যে বিনিয়োগ তোমার রাতের ঘুম কেড়ে নেয় তা সম্পদ নয় বরং এক বিষাক্ত ব্যাধি।"
তিনি দোলনা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বৈদ্যুতিক লণ্ঠনের ম্লান সোনালী আলোয় তাঁর ছায়াটা দেওয়ালে এক দীর্ঘ মহীরুহের মতো দেখাল। তিনি আবার বললেন "শহরে পাণ্ডিত্যের অভাব নেই। সেখানে তথ্যের পাহাড় আর কৌশলের ব্যর্থ গবেষণা দিয়ে মানুষ বাজারকে বশ করতে চায়। কিন্তু এই দীর্ঘ জীবনে আমি দেখেছি সেইসব অতিরিক্ত পাণ্ডিত্যের দম্ভ শেষ পর্যন্ত খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। তার চেয়ে সহজ ধৈর্য আর সময়ের ওপর অচপল বিশ্বাসই হলো বিনিয়োগের আসল সম্পদ। পাহাড় যেমন হাজার বছরের ঝড়েও তার জায়গা ছাড়ে না বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীকেও ঠিক তেমনই নিজের স্থিরতায় অটল থাকতে হয়।"
ডলার কাকু যখন ভেতরের দিকে ধীর পায়ে হেঁটে গেলেন তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো বিনিয়োগের এই শেষ পাঠটি আসলে জীবনেরই এক পরম সত্য। আমরা যা খুঁজি তা বাইরের কোলাহলে নেই তা আছে মনের গহীনে এক শান্ত সমাহিত স্থিরতায়।
বিদায় নিয়ে যখন সেই প্রাচীন জমিদার বাড়ির ফটক পেরিয়ে বাইরে এলাম পাহাড়ের বুক চিরে উঠে যাওয়া আঁকাবাঁকা পিচঢালা রাস্তাটা নাক্ষত্রিক আলোয় এক দীর্ঘ কালো ফিতের মতো উপরের দিকে উঠে গেছে। চারপাশটা যেন হঠাতই এক আদিম রহস্যে কথা বলতে শুরু করেছে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে যে নিবিড় বনানী তারা জোৎস্নার রুপালি ধারাস্নানে এক আশ্চর্য ধূসর রূপ ধারণ করেছে। বনের গভীর থেকে ভেসে আসা নাম না জানা লতাগুল্মের বুনো ঘ্রাণ আর পাহাড়ি ঝর্ণার সেই দূরস্পন্দিত পতনধ্বনি মিলেমিশে এক নিস্তব্ধতা তৈরি করেছে যা নাগরিক মানুষের কানে কোনো এক অচেনা বৈরাগ্যের সুরের মতো বাজে।
রাতের হিম তখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। রাস্তার দুই পাশে পাহাড়ের ধাপে ধাপে সাজানো গ্রামটির ছোট ছোট ঘরগুলো যেন একেকটি নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের স্বপ্ন হয়ে মায়ায় জড়িয়ে আছে। শীতের কামড় থেকে বাঁচতে প্রতিটি বাড়ির জানলাই নিচ্ছিদ্রভাবে বন্ধ কিন্তু সেই বন্ধ জানলার রঙিন কাঁচের ভেতর দিয়ে যে ক্ষীণ আলোর আভা বাইরে চুঁইয়ে আসছে তা কুয়াশার পর্দায় ধাক্কা খেয়ে এক বিচিত্র রঙের আলপনা তৈরি করেছে। কোথাও নীলচে কাঁচের ভেতর দিয়ে ম্লান জ্যোতির স্ফুরণ, কোথাও বা সিঁদুরে লাল আভা। সেইসব বিচিত্র বর্ণচ্ছটা যখন রাস্তার সোলার লাইটের সোনালি আলো আর আকাশের ধবল জ্যোৎস্নার সাথে কুয়াশাময় প্রকৃতিতে মিশে যাচ্ছে তখন মনে হচ্ছে আমি কোনো মর্ত্যের পথ দিয়ে নয় বরং অনন্তের এক মায়াবী সুরলোকের মধ্য দিয়ে একা হেঁটে চলেছি।
আমার গেস্ট হাউসটি আরও উঁচুতে যেন পাহাড়ের মাথায় মেঘেদের প্রতিবেশী হয়ে বসে আছে। সেই চড়াই পথ ধরে নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল ডলার কাকুর বারান্দা থেকে আমি শুধু এক বৃদ্ধের ডায়েরির গল্প নিয়ে ফিরছি না বরং এক পরম আশ্বাসের মন্ত্র বুকে করে নিয়ে যাচ্ছি। শহরের সেই কর্কশ কোলাহল শেয়ার বাজারের উন্মাদনাময় চিৎকার আর মুহূর্তের লাভ ক্ষতির হাহাকার থেকে যোজন যোজন দূরে এই নিভৃত পাহাড়তলিতে বসে এক স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষ মহাকালের নাড়ী টিপে ভবিষ্যতের গান গাইছেন। তিনি কোনো জাদুকর নন তিনি শুধু প্রকৃতির ঋতুচক্রের মতো বাজারের ওঠা পড়াকে চিনতে পেরেছেন।
কুয়াশার ভেতর দিয়ে নিজের পায়ের শব্দের প্রতিধ্বনি শুনতে শুনতে ভাবছিলাম ডলার কাকু ঠিকই বলেছেন। আমাদের এই পথ হয়তো অনেক দীর্ঘ। হয়তো অনেক বাঁক আর চড়াই উতরাই সেখানে ওত পেতে আছে। কিন্তু পাহাড়ের গাম্ভীর্য আর নদীর প্রবহমানতাকে যারা নিজের হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছে তারা জানে যে ধীরস্থিরভাবে পা ফেলে চললে গন্তব্য একদিন ঠিকই ধরা দেবে। সুদূর পর্বতশৃঙ্গের আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া ওই নির্মল চাঁদটা তখন যেন কাকুর সেই প্রশান্ত হাসিটুকুই ছড়িয়ে দিচ্ছে চরাচরময়। নিঃশব্দে বলছে "ব্যস্ত হয়ো না সময়কে সময় দাও সে তোমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে জানে।"
কুয়াশামাখা সেই রূপকথার দেশ পেছনে ফেলে আমি যখন গেস্ট হাউসের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম নিচে মায়াবী আলোর বিন্দুগুলো তখন যেন এক বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জের মতো শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। কাল নতুন সূর্য উঠবে, কিন্তু আজকের এই প্রাপ্তি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সঞ্চয় হয়ে স্মৃতির মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকবে।
ভাস্কর বসু, মাইকেলনগর, কোলকাতা

Superb write up
উত্তরমুছুনধন্যবাদ 🙏
মুছুনঅসাধারণ উপস্থাপনা
উত্তরমুছুনধন্যবাদ 🙏
মুছুন