ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬

শেয়ারবাজারের এক শতাব্দী: মায়ার খেলা ও সময়ের মহাকাব্য

Symbolic illustration of stock market history showing fear, greed, bull market growth, crashes, time, and long-term investing.
শেয়ারবাজারের ইতিহাস আসলে মানুষের ভয়, লোভ, আশা আর সময়ের গল্প।

সংখ্যার আড়ালে মানুষ: শেয়ারবাজারের শতবর্ষের মহাকাব্য

শেয়ারবাজারের এই সুদীর্ঘ ইতিহাস আসলে নিছক কোনো গাণিতিক সংখ্যার নিস্প্রাণ খতিয়ান কিংবা জড় খাতার হিসাব নয় বরং তা হলো রক্তমাংসের মানুষের এক পরম বিচিত্র ও বর্ণিল জীবনকাব্য। আমরা যখন মায়াভরা কম্পিউটারের পর্দায় জটিল সব চার্টের বক্ররেখা দেখি কিংবা সূচকের ঊর্ধ্বগতি আর নিম্নগতি নিয়ে অতি সূক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণ করি অথবা যখন শতকরা হিসাবের এক অন্তহীন গোলকধাঁধায় নিজেদের হারিয়ে ফেলি তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে এ যেন কেবল অর্থনীতির কিছু শুষ্ক ও নিরস পরিসংখ্যানের জটিল খেলা। কিন্তু সেই উজ্জ্বল পিক্সেল আর জ্যামিতিক গ্রাফের একটু গভীরে যদি আমরা স্থির চিত্তে অভিনিবেশ করি তবে স্পষ্ট বোঝা যায় যে প্রতিটি সংখ্যার স্পন্দনের অন্তরালে পরম যত্নে লুকিয়ে আছে কোনো এক মানুষের বুকফাটা ভয় অথবা কারো আকাশচুম্বী সীমাহীন লোভ কিংবা কারো হৃদয়ে সযতনে লালিত ক্ষীণ আশা এবং কারো দম্ভমিশ্রিত অহংকার ও করুণ বিস্মৃতি। মহাকাল যেন এক অদৃশ্য লিপিকারের মতো বারবার একই গল্পের পুরনো পাণ্ডুলিপি নতুন করে লিখে যায় যেখানে কেবল সময়ের প্রয়োজনে চরিত্ররা বদলে যায় এবং তাদের পরিহিত পোশাক পাল্টায় ও মুখের বুলি পাল্টে যায় কিন্তু সেই গল্পের আদিম ও অকৃত্রিম কাঠামোটি চিরকাল অপরিবর্তিত থেকে যায়। সেই মহাকাব্যের প্রকৃত সূচনা আমরা খুঁজে পাই ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই শেষভাগে যখন আধুনিক শেয়ারবাজারের এক সুবিশাল ও দীর্ঘ পরিসংখ্যানিক ইতিহাস প্রথমবার আপন ধুলোবালি ঝেড়ে পৃথিবীর মঞ্চে সগৌরবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। এই ইতিহাস কেবল সম্পদের উত্থান পতনের নয় বরং তা হলো মানুষের চিরন্তন আবেগ আর প্রবৃত্তির এক মহোত্তম মহাকাব্য যা আজও আমাদের সমানভাবে বিস্মিত করে।

​আঠারোশ একাত্তর সালের সেই স্মরণীয় সময়কাল থেকে আমরা প্রথমবারের মতো এমন এক নিরবচ্ছিন্ন ও অমূল্য তথ্যের ভাণ্ডার খুঁজে পাই যেখানে শেয়ারের বাজারদর এবং কোম্পানির বার্ষিক আয় ও লভ্যাংশকে এক অবিচ্ছেদ্য সূত্রে গেঁথে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এই তিনটি গাণিতিক বিষয়কে আসলে কখনোই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে চেনা বা বোঝা সম্ভব নয় কারণ তারা এক নিবিড় ও রহস্যময় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। শেয়ারের দাম হলো মানুষের অন্তহীন ও রঙিন প্রত্যাশার এক অলীক প্রতিফলন আর কোম্পানির আয় হলো পৃথিবীর কঠিন ও রুক্ষ বাস্তবতা এবং লভ্যাংশ হলো সেই কঠোর বাস্তবতার এক পরম স্পর্শযোগ্য ও মধুময় অংশ। এই বিচিত্র ত্রয়ীর পারস্পরিক সম্পর্ক কখনো নিস্তরঙ্গ দিঘির মতো শান্ত আবার কখনো উত্তাল সমুদ্রের মতো ভয়ংকর উত্তেজিত কিংবা কখনো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয়। কিন্তু জীবন ও জগতের এই গূঢ় রহস্যের মতো যখন কোনো সমঝদার মানুষ এই তিনটি ভিন্ন উপাদানকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শেখেন তখনই কেবল তার চোখের সামনে বাজারের সেই প্রকৃত ও আদি চরিত্রটি উন্মোচিত হয়। একজন বিনিয়োগকারী যখন একটি শেয়ার ক্রয় করেন তখন তিনি আসলে নিছক কোনো কাগজের টুকরো কিংবা প্রাণহীন ডিজিটাল নথির মালিকানা লাভ করেন না বরং তিনি নিজের অজান্তেই কিনে নেন একটি আগামীর ব্যবসার ভবিষ্যৎ এবং একটি সামগ্রিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা ও সর্বোপরি মানুষের সম্মিলিত বিশ্বাসের এক অতি ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী অংশ। মানুষের এই অদম্য বিশ্বাস যখন সুদৃঢ় হয় তখন বাজার রাজহংসের মতো সগৌরবে ঊর্ধ্বমুখী হয় আর যখন সেই বিশ্বাসে সামান্য ফাটল ধরে বা তা দুর্বল হয়ে পড়ে তখন বাজার মুহূর্তেই ক্লান্ত হয়ে নতজানু হয়ে পড়ে। তাই শেয়ারবাজারের ইতিহাস পাঠ করা কেবল কোনো পাণ্ডিত্যের প্রদর্শনী নয় বরং এটি হলো এই অনিশ্চয়তার দুনিয়ায় টিকে থাকার এক অমোঘ কৌশল ও আত্মরক্ষার মজবুত বর্ম। যে বিনিয়োগকারী ইতিহাসের সেই ধূলিধূসরিত পাতায় গভীর অভিনিবেশ সহকারে চোখ রাখেন না তিনি যেন এক দিগন্তহীন ও কূলহীন সমুদ্রে ক্ষুদ্র তরণী নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অথচ তিনি সেই সমুদ্রের চিরন্তন জোয়ার ভাটার নিয়মকানুন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান রাখেন না।

​বিংশ শতাব্দীর সেই উদীয়মান সূচনালগ্নে বাজারের পরিবেশ ছিল আশ্চর্যরকম শান্ত এবং এক স্নিগ্ধ মন্থরতায় আচ্ছন্ন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের সেই প্রলয়ঙ্করী অস্থিরতা আর ঝড়ঝাপ্টা পেরিয়ে বাজার তখন তিলে তিলে নিজের এক নিশ্চিত ও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। ১৯০০ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ সময়খণ্ডটিকে যদি আমরা আধুনিক শেয়ারবাজারের এক নির্মল শৈশব বলি তবে মোটেও ভুল হবে না। এই সুদীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ে শেয়ারবাজারে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ছিল অতি সামান্য যা আজকের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর রুদ্ধশ্বাস গতির যুগে দাঁড়িয়ে স্থবিরতা বলে ভ্রম হতে পারে। কিন্তু তখনকার দিনের স্থিতধী বিনিয়োগকারীদের কাছে সেই অতি ধীর চলাই ছিল স্থিতিশীল অগ্রগতির এক অনন্য নিদর্শন। শেয়ার কেনা তখন কোনো চটজলদি লাভের অংক ছিল না বরং তা ছিল মানুষের ধৈর্যের এক কঠিন ও অগ্নিপরীক্ষা। মানুষ তখন শেয়ারের পেছনে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করত কারণ তারা সেই ব্যবসার অন্তর্নিহিত শক্তি আর উদ্যোক্তাদের অবিচল সততার ওপর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস রাখত। দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন তখনও বিনিয়োগের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেনি। বরং এক ধরনের মিতব্যয়িতা আর দীর্ঘমেয়াদী পরম নির্ভরতাই ছিল সেই যুগের বিনিয়োগ সংস্কৃতির মূল ভিত্তি যা বাজারকে এক স্নিগ্ধ গাম্ভীর্য দান করেছিল।

​কালের চাকা ঘোরার সাথে সাথে চেনা পৃথিবীর সেই শান্ত ও মন্থর দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হতে শুরু করল। ঊনবিংশ শতাব্দীর জড়তা কাটিয়ে পৃথিবী যখন বিংশ শতাব্দীর আলোকোজ্জ্বল পথে পা বাড়ালো তখন ১৯২০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শেয়ারবাজারের গতিপথ আচমকা এক বন্য ও উদ্দাম উন্মাদনায় মেতে উঠল। চারদিকে তখন এক অভূতপূর্ব জাগরণের সুর বেজে উঠেছিল কারণ নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিচ্ছিল আর কলকারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া যেন উন্নতির নতুন জয়গান গাইছিল। একে একে বেতার তরঙ্গ আর মোটরগাড়ির চাকা পৃথিবীকে ছোট করে আনছিল এবং শিল্পের এই অবারিত বিস্তার ও আধুনিক শহরের জৌলুসময় প্রসার সাধারণ মানুষের অবচেতন মনে এক অটল ও অজেয় বিশ্বাসের জন্ম দিল। সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে বিত্তবান শিল্পপতি পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করল যে বৈভবের এই স্বর্ণালী যাত্রা বোধহয় কোনোদিন আর থামবে না এবং দারিদ্র্য বুঝি চিরতরে নির্বাসিত হয়েছে। মানুষের এই অন্ধ ও লাগামহীন বিশ্বাসই আসলে অলক্ষ্যে ১৯২৯ সালের সেই প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়ের বিষাক্ত বীজ সযতনে বপন করে চলেছিল। যখন একদিন আকস্মিকভাবে তাসের ঘরের মতো শেয়ারবাজারের বিশাল ইমারতটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তখন তা কেবল খাতা কলমের কোনো অর্থনৈতিক পতন হয়ে রইল না বরং সেটি ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত লালসা ও অদম্য বিশ্বাসের এক চরম ও নির্মম পরাজয়। যে বাজারকে কয়েকদিন আগেও মানুষ অন্তহীন সমৃদ্ধি আর চিরন্তন অগ্রগতির একমাত্র পবিত্র প্রতীক বলে পূজা করত সেই বাজারই মুহূর্তের ব্যবধানে এক গভীর অন্ধকার আর ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার যমদূত হয়ে দেখা দিল।

​১৯২৯ সালের সেই মহাপ্রলয়ের পর থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২০ বছর পৃথিবীর ইতিহাসে এক সীমাহীন রিক্ততা ও গভীর বিষাদের কালখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেই ভয়াবহ ধসের পরবর্তী সময়গুলো ছিল মানুষের জন্য চরম হতাশা ও রুদ্ধশ্বাস যন্ত্রণার এক দীর্ঘ পথ চলা। একদিকে বিশ্বজুড়ে থাবা বসানো মহামন্দার করাল গ্রাস আর অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রলয়নাচন মানুষের যাপিত জীবনকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়কাল ধরে অর্থনৈতিক অস্থিরতা আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মনে এমন এক গভীর ও রক্তাক্ত ক্ষত তৈরি করেছিল যা বহু বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সহজে উপশম হয়নি। বাজারের সেই উদ্দাম চঞ্চলতা তখন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং শেয়ারের দরগুলো যেন নিস্প্রাণ পাথরের মতো এক জায়গায় স্থির হয়ে পড়েছিল। হৃতসর্বস্ব ও দিশেহারা বহু মানুষ তখন নিদারুণ আতঙ্কে আর ঘৃণায় চিরতরে শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল কারণ তাদের কাছে শেয়ার তখন আর কোনো নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ ছিল না বরং তা হয়ে উঠেছিল এক সর্বনাশা জুয়া ও বিপজ্জনক জল্পনার এক বিভীষিকাময় প্রতীক। ইতিহাসের এই ধূসর ও নিরানন্দ অধ্যায় আমাদের এই পরম শিক্ষাই দিয়ে যায় যে যখন কোনো বিশাল পতনের আঘাতে মানুষের দীর্ঘদিনের তিল তিল করে গড়া বিশ্বাস চুরমার হয়ে যায় তখন সেই বাজারে এক অতি দীর্ঘ ও অতল নীরবতা নেমে আসে যা কাটাতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

​ইতিহাসের ধর্মই হলো নিরন্তর বয়ে চলা আর তাই যুদ্ধের সেই কালবেলা পার করে সময় কখনো এক জায়গায় স্থির হয়ে থমকে থাকেনি। উনিশশ উনপঞ্চাশ সালের সেই সন্ধিক্ষণের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে শুরু হলো এক অভাবনীয় ও বিস্ময়কর উত্থানের মহাকাব্য যা ইতিপূর্বে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই লেলিহান শিখা নিভে যাওয়ার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে পৃথিবী আবার নতুন প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেল এবং থমকে যাওয়া অর্থনীতি যেন ফিরে পেল তার হারানো যৌবন ও দুর্মর শক্তি। নব্য শিল্পায়ন আর বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় প্রযুক্তির যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটল তাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আমূল বদলে যেতে শুরু করল এবং ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল আধুনিকতার ছোঁয়া। ঝিমিয়ে পড়া শেয়ারবাজার তখন আর মন্থর গতিতে নয় বরং অদম্য এক নেশায় সামনের দিকে দ্রুতগতিতে ছুটতে শুরু করল এবং দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে বিনিয়োগের সেই অঙ্কগুলো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হলো। মানুষের মনের সেই পুরনো ক্ষতগুলো সময়ের প্রলেপে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল এবং তারা আবার নতুন করে বুকভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করল যে শেয়ারই হলো আগামী দিনের সোনালি ভবিষ্যতের একমাত্র রাজপথ। জনমানসে তখন কেবলই লাভের গুঞ্জন আর সমৃদ্ধির হাতছানি কিন্তু ইতিহাসের সেই অমোঘ নিয়মটি আড়ালে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসছিল কারণ ইতিহাস আমাদের বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়ে যায় যে যখন মানুষের আশা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে অতিমাত্রায় স্ফীত হয়ে ওঠে ঠিক তখনই অন্তরালে কোনো এক বড় বিপদের অশুভ সূচনা ঘটে।

​উনিশশ ষাটের দশকের শেষলগ্নে পৌঁছে মানুষের আত্মবিশ্বাস যখন আকাশ স্পর্শ করল তখন তারা এক অদ্ভুত ও বিভ্রান্তিকর দর্শনে দীক্ষিত হতে শুরু করল। সেই সময়ের বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত দম্ভের সাথে ভাবতে শুরু করলেন যে সেকালের পুরনো ধ্যানধারণা আর আর্থিক নিয়মকানুনগুলো বুঝি এই আধুনিক যুগে একেবারেই অচল ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। প্রতিটি বিশেষ যুগেই মানুষ নিজেকে অনন্য মনে করে এবং ভাবে যে তাদের সময়টি বোধহয় আগের সব সময়ের চেয়ে আলাদা ও শ্রেষ্ঠ। কিন্তু শেয়ারবাজারের নিষ্ঠুর ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে এই অহমিকা মিশ্রিত ধারণাই হলো বিনিয়োগের জগতের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর ফাঁদ। উনিশশ আটষট্টি থেকে উনিশশ সত্তর সালের সেই আকস্মিক ও তীব্র পতন মানুষকে পুনরায় এক নিদারুণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল এবং চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দিল যে এই বাজার আসলে কোনোদিনই কারো জন্য পুরোপুরি নিরাপদ কিংবা নিশ্চিত কোনো বিচরণভূমি নয়। ঠিক এই অস্থির সময়কালেই বিনিয়োগের তত্ত্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটেছিল যা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আগে নিয়ম ছিল যে শেয়ার থেকে পাওয়া লভ্যাংশের আয় বন্ডের সুদের তুলনায় সব সময় বেশি হতে হবে কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিরাচরিত ও নিরাপদ সম্পর্কটি উল্টে যেতে শুরু করল। বিনিয়োগকারীরা কেবল ভবিষ্যতের চড়া দামের আশায় বর্তমানের কম আয় মেনে নিয়েও পাগলের মতো শেয়ার কিনতে দ্বিধাবোধ করল না কারণ তাদের মনে এই অটল বিশ্বাস গেঁথে গিয়েছিল যে শেয়ারের দাম চিরকাল ঊর্ধ্বমুখীই থাকবে।

​নব্বইয়ের দশকের শেষলগ্নে পৌঁছে ইতিহাসের সেই পুরনো নাটকের মঞ্চে এক নতুন আর মায়াবী দৃশ্যপটের অবতারণা হলো যা আধুনিক লগ্নিকারীদের স্মৃতিতে আজও এক বিস্ময়কর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইন্টারনেটের জাদুকরী ছোঁয়ায় তখন পুরো পৃথিবী এক অভাবনীয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছিল এবং মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে নতুন এই ডিজিটাল বিশ্বব্যবস্থায় পুরনো দিনের লাভ লোকসানের সেকেলে অংকগুলো বুঝি পুরোপুরি অচল ও অর্থহীন হয়ে পড়েছে। সেই উন্মাদনার কালে একেকটি নবীন কোম্পানি যাদের পকেটে লাভের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত ছিল না কেবল নামের শেষে একটি প্রযুক্তির তকমা থাকার কারণে তাদের শেয়ারের দর রাতারাতি হিমালয়ের চূড়া স্পর্শ করল। যুক্তি আর কাণ্ডজ্ঞান তখন আবেগের জোয়ারে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল এবং মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ সেই অনিশ্চিত স্বপ্নের পেছনে জলের মতো ঢালতে শুরু করল। কিন্তু মহাকাল তার আপন গতিতে চলে এবং বাজারের অমোঘ নিয়মগুলো কারো অন্ধ বিশ্বাসের তোয়াক্কা করে না। যখন প্রত্যাশার সেই বিশাল বুদবুদটি পূর্ণতা পেল তখন অত্যন্ত নির্মমভাবে তা একদিন সশব্দে ফেটে গেল এবং আকাশছোঁয়া দামগুলো মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে গেল। প্রতিটি পতনই আসলে মানুষের বিস্মৃতি আর দম্ভের এক একটি করুণ স্মারক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে রয়ে যায়।

​ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই কৃষ্ণ মঙ্গলবার বা ব্ল্যাক টুয়েসডে নামক অভিশপ্ত দিনটির কথা ভাবলে আজও অর্থনৈতিক বিশ্ব এক অজানা আতঙ্কে শিউরে ওঠে। সেই দিনটি কেবল ওয়াল স্ট্রিটের পতন ছিল না বরং সেটি ছিল একটি যুগের সমাপ্তি। মানুষ তখন এতটাই মরীচিকাগ্রস্ত ছিল যে তারা ঘরবাড়ি বন্ধক রেখে এমনকি ঋণের টাকায় শেয়ার কিনত কারণ তাদের মনে হয়েছিল এই উন্নতির জোয়ার কোনোদিন থামবে না। যখন সেই বিশাল বুদবুদটি ফেটে গেল তখন দেখা গেল রাতারাতি কোটিপতিরা পথের ভিখারিতে পরিণত হয়েছেন এবং ব্যাংকের দরজায় মানুষের দীর্ঘ হাহাকারমাখা সারি পড়ে গেছে। এই মহামন্দা আমাদের শিখিয়েছিল যে কোনো সম্পদই তার প্রকৃত আয়ের চেয়ে বেশি দামে চিরকাল টিকে থাকতে পারে না এবং বাজারের শৃঙ্খলা যখন ভেঙে পড়ে তখন তা পুনরুদ্ধার করতে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যায়। ঠিক একইভাবে নব্বইয়ের দশকের সেই ডট কম বাবল বা প্রযুক্তির মায়া ছিল এক আধুনিক উন্মাদনা। তখন মানুষের হাতে ছিল ইন্টারনেট নামক এক জাদুর কাঠি। বিনিয়োগকারীরা মনে করেছিলেন যে পুরনো দিনের লাভ লোকসানের অংকগুলো বুঝি এখন জাদুঘরে পাঠানোর সময় এসেছে। এমন সব কোম্পানির শেয়ারের দাম কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছিল যাদের আয়ের কোনো উৎসই ছিল না বরং তারা কেবল ভবিষ্যতে লাভ করবে এই আশাতেই মানুষ অন্ধের মতো টাকা ঢেলেছিল। যখন সেই রঙিন স্বপ্নভঙ্গ হলো তখন দেখা গেল যে প্রযুক্তির নাম ভাঙিয়ে হাজার হাজার অন্তঃসারশূন্য কোম্পানি সাধারণ মানুষের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় গ্রাস করে নিয়েছে। ইতিহাস যেন বারবার অট্টহাসি হেসে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ বারবার তার লোভের কাছে হার মানে কিন্তু বাজার তার আদি ও অকৃত্রিম নিয়মে বিচার করে।

​দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার সবসময় লাভ দেয় এই বিশ্বাস আংশিক সত্য হলেও সম্পূর্ণ সত্য নয়। ইতিহাসের ধূলিধূসরিত পাতা উল্টে দেখলে আমরা দেখতে পাই যে সময়ের বিবর্তনে কত অসংখ্য কোম্পানি অত্যন্ত প্রতাপের সাথে বাজারে আত্মপ্রকাশ করেছিল এবং আবার একদিন নিঃশব্দে মহাকালের অতল গর্ভে হারিয়েও গেছে। আমরা আজ যেসব নামী দামী কোম্পানির সাফল্যের কাহিনী শুনে রোমাঞ্চিত হই এবং যাদের সূচকের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলি তারা আসলে ইতিহাসের সেই বিরল কতিপয় ভাগ্যবান যারা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কোনোমতে টিকে থাকতে পেরেছে বলেই আজ আমাদের আলোচনায় স্থান পায়। কিন্তু তাদের উজ্জ্বল আলোর ঠিক পেছনেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে হাজার হাজার এমন সব কোম্পানি যাদের নাম আজ আর কারো স্মরণে নেই এবং যারা একসময় বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এলেও আজ ইতিহাসের অন্ধকারে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এই রূঢ় ও নির্মম বাস্তবতা আমাদের বারবার এই সতর্কবাণী শুনিয়ে যায় যে বাজারের ইতিহাস আসলে কেবল সফল বীরদের জয়গান গাওয়ার রঙিন কোনো গল্প নয় বরং এটি অগণিত পরাজিত ও ব্যর্থদের নিঃশব্দ কান্নার এক বিশাল বিষাদসিন্ধু। প্রতিটি আকাশছোঁয়া সাফল্যের গল্পের নিচে চাপা পড়ে আছে শত সহস্র ব্যর্থতার ধূলিকণা যা আমরা সচরাচর এড়িয়ে যেতে পছন্দ করি। তাই অন্ধভাবে কেবল দীর্ঘমেয়াদী লাভের আশায় মগ্ন না থেকে এই মুদ্রার অপর পিঠটি দেখাও একজন সচেতন মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বাজারের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে জয় আর পরাজয় মুদ্রার এপিঠ ওপিঠের মতো মিশে থাকে যা আমাদের শেখায় যে প্রতিটি পদক্ষেপ কতখানি সতর্কতার সাথে ফেলা প্রয়োজন।

​সবশেষে বলা যায় যে এই চঞ্চল ও রহস্যময় শেয়ারবাজার আমাদের জীবনের এক পরম ও গভীর জীবনদর্শন শিক্ষা দিয়ে যায়। অনাগত ভবিষ্যৎ যে কোনোদিন কারো কাছে পুরোপুরি নিশ্চিত বা ধরাবাঁধা নয় সেই সত্যটিই হলো বিনিয়োগের জগতের প্রধান ধ্রুবক। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক ভুলটি তারাই করে বসে যারা অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে মনে করে যে তারা ভবিষ্যতের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং বাঁকগুলো আগে থেকেই সুনিশ্চিতভাবে জেনে গেছে। আসলে এই অনিশ্চয়তার সমুদ্রে বিনয়ী থাকাই হলো একজন বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় এবং অপরাজেয় শক্তির উৎস। নিজের আকাশচুম্বী প্রত্যাশাকে বাস্তবের লাগাম দিয়ে বেঁধে রাখা অথচ মনের ভেতরের সুন্দর আগামীর আশাটিকে প্রদীপের শিখার মতো জ্বালিয়ে রাখাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমানের সার্থক পথ। শেয়ারবাজারের এই বিশাল ও মহাকাব্যিক গল্পের আসলে কোনোদিন ইতি ঘটে না কারণ সময়ের বহমান স্রোতের সাথে সাথে সেখানে নিত্যনতুন বিচিত্র সব অধ্যায় যুক্ত হতে থাকে। হয়তো কালক্রমে নতুন কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আসবে কিংবা নতুন কোনো অর্থনীতির তত্ত্ব আমাদের মোহাচ্ছন্ন করবে এবং নতুন নতুন রঙিন স্বপ্নের জন্ম হবে কিন্তু হাজার বছর ধরে চলে আসা মানুষের সেই মৌলিক স্বভাব আর আবেগগুলো কোনোদিন বদলাবে না। সেই একই লোভ আর একই ভয় বারবার নতুন সাজে ফিরে আসবে। তাই বাজারের এই দীর্ঘ ইতিহাস নিবিড়ভাবে পড়া মানে আসলে রক্তমাংসের মানুষেরই আদি ও অকৃত্রিম ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করা। আর যে প্রাজ্ঞ বিনিয়োগকারী ইতিহাসের এই নিগূঢ় রহস্যটি নিজের হৃদয়ে উপলব্ধি করতে পারেন তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন যে এই অস্থির বাজারে সবচেয়ে বড় সম্পদ আসলে পকেটে থাকা নগদ টাকা নয় বরং সবচেয়ে মূল্যবান ও অবিনশ্বর সম্পদ হলো ধৈর্য আর সময়। সময়ের এই বিনিয়োগই শেষ পর্যন্ত মানুষকে প্রকৃত সমৃদ্ধির বন্দরে পৌঁছে দেয় যেখানে সংখ্যার চেয়ে অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক বেশি।

সময়কাল ও ঘটনা

মূল পরিসংখ্যান ও তথ্য

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

১৯০০ — ১৯২৪: স্থিরতার যুগ

গড় বার্ষিক রিটার্ন ছিল মাত্র ৩% থেকে ৫%।

মানুষ লভ্যাংশ এবং ব্যবসার স্থিতিশীলতায় বিশ্বাস রাখত।

১৯২৯: মহাধস (ব্ল্যাক টুয়েসডে)

সূচক মাত্র কয়েক দিনে ২৫% এবং তিন বছরে ৮৯% পড়ে যায়।

অদম্য লোভ থেকে চরম ভীতি ও অবিশ্বাসের জন্ম নেয়।

১৯২৯ — ১৯৪৯: দীর্ঘ বিষাদকাল

বাজার আগের অবস্থানে ফিরতে সময় নেয় দীর্ঘ ২৫ বছর।

মানুষ শেয়ারকে বিপজ্জনক জুয়া হিসেবে গণ্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

১৯৪৯ — ১৯৬৮: উত্থানের স্বর্ণযুগ

এস এন্ড পি ৫০০ (S&P 500) সূচক এই সময়ে প্রায় ৫০০% বৃদ্ধি পায়।

যুদ্ধোত্তর নতুন পৃথিবী ও আধুনিক প্রযুক্তিতে মানুষের প্রবল আস্থা।

১৯৭০ এর দশক: কাঠামোগত বদল

বন্ডের আয় শেয়ারের লভ্যাংশকে ছাড়িয়ে যায়। লভ্যাংশ ৩%-এ নেমে আসে।

মানুষ নগদ আয়ের চেয়ে শেয়ারের দাম বাড়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।

২০০০: ডট কম বুদবুদ

নাসডাক (NASDAQ) সূচক মাত্র দুই বছরে ৭৮% ধসে পড়ে।

অবাস্তব স্বপ্নের মায়াভঙ্গ এবং প্রযুক্তির অতিমূল্যায়নের করুণ পরিণতি।

দীর্ঘমেয়াদী গড় (১৮৭১ — ২০২৬)

মুদ্রাস্ফীতি বাদে শেয়ারের গড় প্রকৃত রিটার্ন প্রায় ৬.৫% থেকে ৭%।

ধৈর্যশীল বিনিয়োগকারীরাই ইতিহাসের দীর্ঘ পথ চলায় জয়ী হয়।

বাস্তবতা: পরাজিতদের গল্প

১৯৫৫ সালের ফরচুন ৫০০ তালিকার মাত্র ১২% কোম্পানি আজ টিকে আছে।

ইতিহাস আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়। আপনার বিনিয়োগ জীবনে কোনো বড় পতন কি আপনাকে নতুন কোনো জীবনদর্শন শিখিয়েছে?


ভাস্কর বসু, মাইকেলনগর, কোলকাতা



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন