ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬

ডলার কাকুর ডায়েরি | পর্ব ৩ : শিষ্টতা ও উত্তরণের পথ — মার্কেট কেন নিচে নামে কিন্তু নিচে থাকে না?

 

এই পর্বে ডলার কাকু ব্যাখ্যা করছেন কেন স্টক মার্কেট সাময়িকভাবে নিচে নামলেও দীর্ঘমেয়াদে নিচে থাকতে পারে না। বিনিয়োগের মনস্তত্ত্ব, শৃঙ্খলা এবং বাজারের প্রকৃত শক্তির সেই গল্প - যা মাত্র ১% মানুষ অনুসরণ করে—নিয়েই আজকের আলোচনা।


জমিদার বাড়ির লাইব্রেরিতে কাঠের টেবিল ও বইয়ের তাকের মাঝে চেয়ারে বসে থাকা সাদা পাঞ্জাবি পরা ডলার কাকুর পোর্ট্রেট

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ডলার কাকুর ডায়রির দ্বিতীয় পর্বের সম্পূর্ণ গল্প জানতে পড়ুন ডলার কাকুর ইনভেস্টমেন্ট লেসন (পর্ব ২)


প্রেক্ষাপট: জমিদার বাড়ির সেই লাইব্রেরি ঘর

পরের রবিবার। বিকেলের আকাশটা আজ একটু মেঘলা, নীলগিরির পাহাড়ের মাথায় ধূসর মেঘেরা যেন জটলা পাকিয়ে কোনো এক গূঢ় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। জমিদার বাড়ির বারান্দায় আজ আর চায়ের আসর বসেনি; বৃষ্টির পূর্বাভাসে আমরা আশ্রয় নিয়েছি কাকুর সেই বইঠাসা লাইব্রেরি ঘরে। চারদিকে পুরোনো বইয়ের মলাট আর চন্দনকাঠের ধূপের ঘ্রাণে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।

ডলার কাকু আজ আরামকেদারায় বসে নেই, জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন। আমি ঘরে ঢুকতেই তিনি ঘাড় না ফিরিয়েই শান্ত গলায় বললেন, “অপূর্ব, গতদিন প্রলোভনের কথা বলেছিলাম না? সেই প্রলোভন জয় করার প্রথম হাতিয়ার হলো নিজের সত্তাকে নতুন করে চেনা। এই যে একটা পরিবর্তন। এটা খুব সূক্ষ্ম, অথচ খুব কঠিন।”

আমি কৌতূহলী হয়ে বসলাম। কাকু এবার আমার দিকে ফিরে ধীরপদে এগিয়ে এলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে আজ এক অদ্ভুত ধ্রুপদী গাম্ভীর্য।


শেয়ার বাজার: যেখানে অহংকারের স্থান নেই

“শোনো অপূর্ব, এই পরিবর্তনটা খুব সহজ মনে হলেও আসলে এক গভীর সাধনা। তুমি কর্পোরেট অফিসে যে কাজ করো, মাসশেষে যে বেতনটা পাও, মা-লক্ষ্মীর সেই আশীর্বাদকে সম্মান করতে শেখো। সেই উপার্জনের একটি পবিত্র অংশ সঞ্চয় করে যখন স্টক মার্কেটে আনবে, তখন সেই অর্থকে কেবল সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; তাকে দেখতে হবে এক ভিন্ন জ্ঞানের আধারে। মনে রাখবে, তোমার অফিসের ডেস্কে তুমি হয়তো শ’খানেক কর্মচারীর ঊর্ধ্বে, তুমি সেখানে 'বস'। কিন্তু শেয়ার বাজারের চৌকাঠে পা রাখামাত্রই তোমার সেই তিলক মুছে ফেলতে হবে। এখানে তুমি কারো সিনিয়র নও, কারো জুনিয়ারও নও। এখানে আমরা সবাই এক অব্যক্ত মহাকালের ছাত্র, কেবলই বাজারের নগণ্য শিষ্য।”

কাকু একটু থামলেন। টেবিলের ওপর রাখা একটা পিতলের বুদ্ধমূর্তির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “অপূর্ব, এই বাজারে তুমি যত বিনয়ী হবে, যত মাথা নিচু করে এর মহিমা স্বীকার করবে, বাজার তোমাকে ততটাই দুহাত ভরে দেবে। আর যদি অহংকার নিয়ে আসো, তবে সেই উদ্ধত শিখর একদিন ধুলোয় মিশবেই। যারা টাকার সম্মান করতে জানে না, যারা অবলীলায় বলে ফেলে, 'টাকার তো চিন্তাই নেই', মা-লক্ষ্মী তাদের কোল থেকে অলক্ষ্যেই বিদায় নেন। যাকে তুমি শ্রদ্ধা করবে না, সে তোমার কাছে আসবে কেন?”

বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির শব্দে কাকুর কথাগুলো যেন আরও ছন্দময় হয়ে উঠল। তিনি বলতে লাগলেন:


শনি ও রবিবারের সঠিক ব্যবহারই কি আপনার ভাগ্য বদলাবে?

“আমাদের মৌলিক ভিতগুলো আগে মজবুত করা চাই। জানো অপূর্ব, আমাদের জীবনের শনি আর রবিবারের সঠিক ব্যবহারই ঠিক করে দেয় আমরা এক স্তর ওপরে উঠব নাকি অতল গহ্বরে তলিয়ে যাব। তুমি জগতের যেকোনো বড় কোম্পানির সিইও (CEO) বা সিএফও-দের (CFO) দিকে তাকিয়ে দেখো। কেউ কি কেবল অফিসের নির্ধারিত সময়ে কাজ করে সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছে? কোনো মানুষই বাতাসে ভর করে হঠাৎ করে 'চিফ' হয়ে যায় না। সিইও হওয়ার জন্য শনি-রবিবারের ওই অবকাশে নিজের দক্ষতা বাড়াতে হয়, অতিরিক্ত শ্রম দিতে হয়। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত শিক্ষা।”

কাকু আমার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর দুচোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি।

“অথচ কী আশ্চর্য দেখো, যখন স্টক মার্কেটের কথা আসে, তখন শিক্ষিত মানুষও ভাবে যে না শিখে, না বুঝে রাতারাতি অসাধ্য সাধন করে ফেলবে! হিমালয় জয়ের পরিকল্পনা ছাড়াই কি এভারেস্টে ওঠা যায় অপূর্ব? বাজারও এক দুর্গম পাহাড়, যার চূড়ায় পৌঁছাতে গেলে কেবল ভাগ্য নয়, বরং প্রতিটি পদক্ষেপে লাগে সুনিপুণ প্রস্তুতি আর পরম ধৈর্য্য।”

ডলার কাকু একটু পায়চারি করলেন। লাইব্রেরি ঘরের পুরোনো কাঠের মেঝেতে তাঁর চটিজুতো জোড়ার মৃদু মচমচে শব্দ যেন এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করছিল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “অপূর্ব, আমি কিন্তু কেবল তোমার মনোভাবের কথা বলছি না। আমি বলছি এক সাধারণ সর্বজনীন মানসিকতার কথা। নিজের অন্তরের খবর রাখা যতটা জরুরি, এই বিশাল পৃথিবীটাকে চেনা ঠিক ততটাই আবশ্যিক। কেন জানো? কারণ তুমি যদি অন্যদের চালচলন বুঝতে না পারো, তবে তাদের ক্রিয়াকলাপের বিপরীতে সঠিক প্রতিক্রিয়া জানাবে কীভাবে?”

জানলার বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বললেন, “৯৯ শতাংশ মানুষ কেন এখানে সর্বস্বান্ত হয়, সেই কারণটা যদি তোমার কাছে পরিষ্কার না থাকে, তবে তুমি নিজের ভুলগুলো শুধরে নেবে কী করে? বাজারে সফল হওয়ার মূল মন্ত্র কিন্তু খুব সোজা। নিজের ভুল সিদ্ধান্তের শিকড়টা খুঁজে বের করো। ৯৯ শতাংশ মানুষ যা যা করে, ঠিক সেই সেই কাজগুলো করা ছেড়ে দাও। আর ১ শতাংশ মানুষ যে পথে হাঁটে, সেই কাঁটাভরা দুর্গম পথটাই বেছে নাও।”

কাকু হঠাৎ আমার একদম কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর দুচোখে তখন এক অদ্ভুত প্রখরতা। “এখন প্রশ্ন হলো, এই কাজটা ঠিক কতটা কঠিন? অপূর্ব, এটা ততটাই কঠিন যতটা কঠিন কাজ থেকে ফিরে এসে ইউটিউবে ডুব না দেওয়া, যতটা কঠিন ফোন থেকে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের আসক্তি মুছে ফেলা, আর যতটা কঠিন শনি-রবিবারের ওই আলসেমি আর অহেতুক ঘুরে বেড়ানো বন্ধ করা। যে জীবনটাকে নিয়ম দিয়ে বেঁধেছে, তার কাছে এটা জলভাত। আর যে আলস্যের দাস, তার কাছে এটা হিমালয় লঙ্ঘনের চেয়েও বড় বাধা।”

কাকু টেবিলের ওপর থেকে একটা ডায়েরি তুলে নিলেন। “মনে রেখো অপূর্ব, বাজারের কোনো কৌশলই কাজ করবে না যতক্ষণ না তোমার জীবনের বাকি স্তম্ভগুলো মজবুত হচ্ছে। তোমার প্রজ্ঞা, তোমার স্বাস্থ্য, তোমার সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা, আর তোমার আত্মশাসন। এই স্তম্ভগুলো যখন ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে যাবে, দেখবে অলৌকিক জাদুর মতো স্টক মার্কেটেও তোমার উন্নতি শুরু হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে!”


১ শতাংশ সফল মানুষের দুর্গম পথ

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম। কাকু একটু হেসে বললেন, “অনেকেই বলে যখন বাজার চনমনে, তখন সবাই নাকি টাকা বানায়। আবার বাজার পড়লে সবাই কপাল চাপড়ায়। তুমিও তো বললে, গত দেড় বছরে তেমন কোনো বড় লাফ দেখা যায়নি। কিন্তু জানো, স্টক মার্কেটে প্রতি তিন বছরে টাকা দ্বিগুণ হয়, এটা ধ্রুব সত্য। ট্যাক্স মিটিয়েও এই অঙ্কটা নিশ্চিত। পতন আর উত্থানের এই দোলাচলের ভেতরেও এই নিয়মটা বদলায় না।”

কাকু এবার নিজের চশমাটা পরিষ্কার করতে করতে একটা অমোঘ সত্য বললেন, “কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যখন বাজার পড়ছিল, তখন যদি তুমিও অন্যদের মতো মুনাফা করতে না পারো, তবে তোমার আর সাধারণের মধ্যে তফাত কী? তোমার দক্ষতাটা ঠিক কোথায়?”

একটু থেমে তিনি নিজেই উত্তর দিলেন, “দক্ষতা এখানেই যে, আমি এটা বুঝে নিয়েছি পড়ন্ত বাজারে আকাশছোঁয়া টাকা তৈরি হয় না। এটাই পরম জ্ঞান। এখানে ‘চৌধুরী’ সাজতে যাওয়া বোকামি। আমি বড় অফিসের ডিরেক্টর হতে পারি, আমি আইআইটি বা আইআইএম-এর প্রখর মেধাবী হতে পারি, আমি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কিংবা বড় চিকিৎসক হতে পারি। কিন্তু এই বাজারের উত্তাল সমুদ্রের সামনে আমার ঐসব ডিগ্রির পরিচয়টা বড়ই তুচ্ছ। এখানে যে বিনয়ী হতে জানে না, সমুদ্র তাকে আছড়ে পিষে ফেলবেই।”

লাইব্রেরি ঘরের ঘড়িতে তখন টং টং করে সাতটা বাজল। কাকুর কথায় আমি যেন এক অন্য সত্যের মুখোমুখি হলাম। বুঝলাম, বাজারটা কেবল শেয়ার কেনা-বেচার জায়গা নয়, এটা নিজেকে নতুন করে গড়ার এক কঠোর কর্মশালা।


গাড়ির চালক ও রেড সিগন্যাল

কাকু একটু পায়চারি করে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে এখন এক তাচ্ছিল্যের হাসি। “অপূর্ব, অনেকেই এসে আমায় একটা বড় অদ্ভুত প্রশ্ন করে। তারা বলে, কাকু, আপনি কিসের এত ভালো চালক যদি আপনিও লাল সংকেত বা রেড লাইটে অন্যদের মতোই থেমে যান? রেড লাইটে তো সাধারণ জনতাও থামে, তবে আপনার বিশেষত্ব কী? তাদের দাবি হলো, জটলা ছিঁড়ে সিগন্যাল ভেঙে বেরিয়ে যাওয়াটাই নাকি বাহাদুরি!”

বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা বাড়ল, যেন কাকুর কথার পিঠে কোনো এক মহাকালের সাক্ষী দিচ্ছে। তিনি আবার শুরু করলেন, “আমি তাদের একটাই কথা বলি, হ্যাঁ, রেড লাইটে থামাটাই নিয়ম। আর যে নিয়ম মেনে চলে, সেই আসলে শ্রেষ্ঠ চালক, সেই আসল বিজয়ী। এখন দেখো, যে নিজেকে অত্যাধিক বুদ্ধিমান মনে করে সিগন্যাল ভেঙে চলে গেলো, তার পরিণতি কী হবে? হয়তো উল্টোদিক থেকে আসা কোনো লরি তাকে পিষে দিয়ে যাবে, নয়তো আইনের জালে তার জরিমানা হবে। আর যদি কোনো অলৌকিক কারণে সে একবার অক্ষত বেঁচে যায়, তবে তার মনে জন্ম নেবে এক বিষাক্ত দম্ভ। যাকে আমরা বলি ‘ওভার কনফিডেন্স’।”

কাকু চশমার কাঁচটা মুছতে মুছতে বললেন, “সেই নকল হিরো পরের বার আরও দ্রুত বেগে আইন ভাঙবে। দ্বিতীয়বারও হয়তো সে বেঁচে গেল। কিন্তু তৃতীয়বারের বেলায়? বুম! সব শেষ। তখন তার গাড়ি চুরমার হবে, সময় নষ্ট হবে, আর নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় এক লহমায় ধুলোয় মিশে যাবে। আর এরপর সে লোকসমাজে বুক ফুলিয়ে কী বলবে জানো? সে বলবে, ড্রাইভিং হলো একটা জুয়া! এখানে যে কোনো সময় যা খুশি হতে পারে। কিন্তু সে একবারও স্বীকার করবে না যে সে রেড লাইটে থামেনি বলেই এই সর্বনাশ।”

আমি কাকুর যুক্তির গভীরতা দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। তিনি এবার আমার দিকে ফিরে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “অপূর্ব, রাস্তা যখন যানজটে ঠাসা, তখন ধীরে চলাই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? অনেকে আমায় বিদ্রূপ করে বলে, ট্র্যাফিকে যদি আপনিও ধীরে চলেন, তবে আপনার ড্রাইভিং স্কিল কোথায়? আরে ভাই, এটাই তো আমার আসল দক্ষতা! এই পরম জ্ঞানটুকু থাকা যে, পথ যখন অবরুদ্ধ তখন ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হয়। আর যখন পথ ফাঁকা, তখন গতিসীমা মেনে দ্রুত চলতে হয়।”

জানলার বাইরে অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এসেছে। কাকু ধীর স্বরে বললেন, “মনে করো, তুমি গাড়ি চালিয়ে দিল্লি থেকে মুম্বাই যাচ্ছ তোমার পরিবারকে নিয়ে। তোমার মূল উদ্দেশ্যটা কী? দ্রুত পৌঁছানো, নাকি নিরাপদে পৌঁছানো? প্রকৃত চালক সেই, যে গতির চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। আঁকাবাঁকা পথে অহেতুক কসরত করে বা টায়ার পাঞ্চার অবস্থায় গাড়ি ছুটিয়ে তুমি কোনো বীরত্ব দেখাচ্ছ না, বরং তুমি বিপদকে ডাকছ। আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে নিরাপত্তার সাথে, গড় গতির চেয়ে সামান্য বেশি বেগে, কিন্তু কোনোভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নয়।”

কাকু আমার কাঁধে হাত রাখলেন। “স্টক মার্কেটটাও ঠিক এই লম্বা রাস্তার মতো, অপূর্ব। এখানে গতির চেয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোটা বেশি জরুরিযে হিরো সাজার চেষ্টা করে, বাজার তাকে চিরদিনের মতো নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। আর যে নিয়ম মেনে চলে, বাজার তাকে দুহাত ভরে আশীর্বাদ করে।”

লাইব্রেরি ঘরের সেই নিস্তব্ধতায় কাকুর কথাগুলো আমার কানের কাছে মন্ত্রের মতো বাজতে লাগল। আমি বুঝতে পারলাম, শেয়ার বাজার কোনো জুয়া নয়, বরং তা হলো ধৈর্যের এক সুদীর্ঘ মহাকাব্য।


ফিউচার অ্যান্ড অপশন ট্রেডিং

কাকু টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসটা তুলে নিলেন। বাইরের বৃষ্টির শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে তাঁর কণ্ঠস্বর এবার যেন কশাঘাতের মতো শোনাতে লাগল। তিনি বললেন, “অপূর্ব, বুঝতে পারছ কি ৯৯ শতাংশ মানুষ ঠিক কোন অতল গর্তে পা দেয়? তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো টাকা দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ করা। আর সেটা করতে হবে চোখের পলকে! আজ হয়তো ‘অপশন’-এ কিছু টাকা লাগাল, আর মনে মনে স্বপ্ন দেখতে লাগল যে চুক্তির মেয়াদ বা ‘এক্সপায়ারি’ শেষ হতে না হতেই তাদের সম্পদ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। কেন জানো? কারণ তার কোনো এক তথাকথিত বন্ধু নাকি এমনটা করে দেখিয়েছে!”

কাকু একটু থামলেন। তাঁর মুখে এক তাচ্ছিল্যভরা বিষণ্ণতা। “অথচ সত্যটা বড়ই করুণ। সেই বন্ধুদের যদি আসল খতিয়ান বা ‘পিএন্ডএল স্টেটমেন্ট’ দেখা যেত, তবে দেখা যেত আদতে কেউ কোনো টাকা তৈরি করতে পারেনি। বছরে টাকা দ্বিগুণ করার এই রূপকথা কেবল মুখে মুখেই ঘোরে। এমনকি যারা এই ‘ফিউচার অ্যান্ড অপশন’ বা ‘এফএন্ডও’ বাজারে সফলতম হিসেবে পরিচিত, যাদের নাম ডাক সারা দেশে, যেমন পিআর সুন্দরের মতো বড় মাপের ট্রেডার তাঁদের বাৎসরিক প্রবৃদ্ধিও কিন্তু ২৫-৩০ শতাংশের বেশি নয়।”

আমি বিস্ময়ে কাকুর দিকে চেয়ে রইলাম। তিনি বলে চললেন, “জানবে অপূর্ব, যখন ওই সফল মানুষগুলো অন্যদের টাকা বিনিয়োগের জন্য নেন, তখন তাঁরা পরিষ্কার বলে দেন, ‘বছরে মাত্র ১৫ শতাংশ লাভের আশা রাখুন, তার বেশি নয়’। ১৫ শতাংশ! কোনো ৫০ বা ১০০ শতাংশ নয়। অথচ একজন সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারী যখন পনেরো হাজার টাকা নিয়ে বাজারে নামে, তখন সে অস্থির হয়ে পড়ে ওই পনেরো হাজার কখন এক লাখে পরিণত হবে, সেই আশায়।”


শনিবারের পার্টি ও মদের বোতল

কাকু এবার আমার একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর দুচোখে তখন এক আশ্চর্য বিদ্রূপের আলো। “দেখো অপূর্ব, এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে আমাদের সমাজ ভরে গেছে। শনিবার রাতের জলসায় হাজার হাজার টাকার দামী মদের বোতল কিনতে এই মানুষগুলোর হাত কাঁপে না। অথচ নিজের বুদ্ধিকে শাণিত করার জন্য এক হাজার টাকা দিয়ে একটা ভালো বই কেনায় তাদের বড় অনীহা। পাঁচ হাজার টাকার বিল অনায়াসে মিটিয়ে দেয় শখের নেশায়, কিন্তু সেই পাঁচ হাজার টাকায় যে বিনিয়োগের পাঁচটি মূল্যবান বই কেনা যায়, তা তাদের মাথায় আসে না।”

বাইরে অন্ধকারের বুক চিরে একবার বিদ্যুত চমকে উঠল। কাকুর কথাগুলো যেন সেই বিদ্যুতের মতোই তীক্ষ্ণ। “তাদের মানসিকতা কেমন জানো? তারা চায় পরের শুক্রবারের আমোদ-প্রমোদের খরচটা যেন এই ‘অপশন’-এর কোনো এক ‘কল’ বা ‘পুট’ কেনা থেকে উঠে আসে। বাজারকে তারা উপার্জনের মন্দির নয়, বরং বিনোদনের খরচ তোলার জায়গা বানিয়ে ফেলেছে। আর তার ফল কী হয়? শুরুতে হয়তো ভাগ্যের জোরে এক-আধটা দান জিতে যায়। কিন্তু তারপর এমন মার খায় যে আসল পুঁজিটাই ধুলোয় মিশে যায়। আর সেই হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার আশায় তারা যখন আরও মরিয়া হয়ে দ্রুতগতিতে দৌড়াতে চায়, তখনই নেমে আসে চূড়ান্ত সর্বনাশ।”

কাকুর কথাগুলো লাইব্রেরি ঘরের নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে দিচ্ছিল। আমি অনুভব করলাম, বিনিয়োগ কোনো জাদুবিদ্যা নয়, বরং তা হলো নিজের প্রবৃত্তিকে শাসন করার এক কঠিন পরীক্ষা।

কাকু কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। জানলার কাঁচের গায়ে বৃষ্টির জল গড়ানোর শব্দের মাঝে তাঁর শ্বাস ফেলার শব্দটাও যেন ভারী হয়ে উঠল। তিনি আবার শুরু করলেন, “অপূর্ব, যখন সেই প্রথম ভুলের চোরাবালিতে কেউ একবার ডুবে যায়, তখন শুরু হয় এক সর্বনাশা খেলা। হারানো পুঁজি উদ্ধার করার নেশায় সে আরও দ্রুত ছুটতে চায়, আর যত দ্রুত ছোটে, তত তাড়াতাড়ি মার খায়। তখন সেই ঋণ ঢাকতে সে অফিসের অগ্রিম বেতন নেয়, ভবিষ্যতের সঞ্চয় বা ‘পিএফ’ (PF)-এর টাকা তুলে আনে। এমনকি যেটুকু টাকা সংসারের ডাল-ভাতের জন্য আলমারির কোণে তুলে রাখা ছিল, প্রলোভনের চাপে সেই পবিত্র সঞ্চয়টুকুও সে বাজারের এই আগুনে আহুতি দেয়। মাথার ওপর তখন দেনার পাহাড় আর বুকের ওপর দ্রুত টাকা ফেরত দেওয়ার অসহ্য চাপ। আর সেই চাপের মুখে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত তাকে নিয়ে যায় চূড়ান্ত বিনাশের দিকে।”


না শিখে করা যেকোনো কাজই জুয়া

কাকু এক অদ্ভুত শান্ত স্বরে বললেন, “আর অবশেষে যখন সব শেষ হয়ে যায়, তখন সে বাজার ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে। আর বেরিয়ে গিয়ে জগৎসংসারকে চিৎকার করে বলে, ‘এ বড় জুয়া! এ হলো এক ফাটকাবাজি!’ অথচ সত্যটা হলো এই, জগতের প্রতিটি কাজই ‘জুয়া’ যদি তা না শিখে করা হয়। সে কাজ যা-ই হোক না কেন।”

বিদ্যুতের নীল আলোয় কাকুর প্রাজ্ঞ মুখটা এক লহমায় যেন কোনো এক গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কের মতো দেখাল। তিনি জোর দিয়ে বললেন, “আবার উল্টোদিকে, প্রতিটি কাজ যা নিষ্ঠাভরে শিখে করা হয়, তা-ই হলো এক একটি পেশা, এক একটি ব্যবসা, এক একটি অনন্য প্রতিভা কিংবা এক সূক্ষ্ম শিল্প। তুমি ভেবে দেখো তো অপূর্ব, রাজপথে যানবাহন চালানো কি স্টক মার্কেটের চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ? প্রতি মুহূর্তে সেখানে প্রাণসংশয়ের ভয়। কিন্তু সেখানে দুর্ঘটনার হার কেন এত কম? কারণ আমরা জানি যে ড্রাইভিং শিখতে হয়। আমরা গাড়ি ছোঁয়ার আগে দাদা, ভাই, বন্ধুর কাছে কিংবা কোনো ট্রেনিং স্কুলে গাড়ি চালানো শিখি। প্রথমে শিখি, তারপর চালকের আসনে বসি। আর চালকের আসনে বসেও আমরা এক অদ্ভুত সুরক্ষা পাই। কারণ আমরা সতর্ক থাকি, আর আমাদের চারপাশে থাকে গাড়ির সেই ইস্পাতের বর্ম। গাড়ি নষ্ট হলেও প্রাণটা বেঁচে যায়।”

কাকু এবার টেবিলটা মৃদু চাপড়ে বললেন, “কিন্তু স্টক মার্কেটে কী হয়? মানুষ না শিখে নামে, সর্বস্বান্ত হয়, তবুও শেখে না। আবার টাকা লাগায়, আবার নষ্ট হয়, তবুও জ্ঞান অর্জন করে না। এই চক্রটা চলতেই থাকে। আর জানো অপূর্ব, এটাই হলো স্টক মার্কেটের এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর সৌন্দর্য। তুমি একবার ভেবে দেখো, যখন ৯৯ শতাংশ লোক নির্বোধের মতো টাকা হারাতেই থাকে, তখন ওই ১ শতাংশ যারা শিখছে, তারা ঠিক কতখানি কামাচ্ছে! ওই ৯৯ শতাংশের রক্তজল করা অর্থই তো ১ শতাংশের অর্জিত মুনাফায় পরিণত হয়।”


কিভাবে নিজেকে ভিড়ের থেকে আলাদা করবে?

লাইব্রেরি ঘরের সেই গাম্ভীর্যের মাঝে কাকুর চোখ দুটি যেন অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠল। “আমি তোমাকে আজ সেটাই শেখাতে চলেছি। ওই ৯৯ শতাংশ মানুষের থেকে তুমি নিজেকে কীভাবে আলাদা করবে। প্রথম যে কাজটি তোমাকে করতে হবে, তা হলো ওই মায়া-বাক্স অর্থাৎ টিভির পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া। মনে রেখো, ওই ১ শতাংশ সফল মানুষ টাকা কামানোর জন্য কখনোই টিভির পর্দায় চোখ রাখে না। তারা অলীক ‘টিপস’-এর পেছনে হন্যে হয়ে ঘোরে না। তারা স্রেফ অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের জ্ঞানকে ঋদ্ধ করে।”

আমি কাকুর কথাগুলো নিজের হৃদয়ের গহীনে গেঁথে নিলাম। বুঝলাম, বাজারটা কোনো লটারি নয়, বরং তা হলো নিজের অর্জিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার এক সুশৃঙ্খল লড়াই।

কাকু পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “অপূর্ব, তুমি কি আমায় বলতে পারো, ওই যে ঝকঝকে পর্দার মায়া-বাক্স অর্থাৎ টেলিভিশনের কোন চ্যানেলে এমন কোনো অনুষ্ঠান হয় যা তোমাকে প্রকৃত ‘শেখা’র পথে নিয়ে যায়? একটিও কি আছে?”

আমি নিরুত্তর। কাকু নিজেই উত্তর দিলেন, “না, নেই। সেখানে কোনো শিক্ষক নেই, আছে শুধু ফেরিওয়ালা। কেউ বলছে এই শেয়ারটা কেনুন, কেউ বলছে ওইটা বেচুন। কেউ ‘স্টপ লস’-এর অঙ্ক কষছে, কেউ মুনাফার গল্প ফাঁদছে। কিন্তু এর নেপথ্যের গূঢ় রহস্যটা কী, কেন এই দাম বাড়ছে বা কমছে! সেই ‘কেন’র উত্তর দেওয়ার মতো সময় বা প্রজ্ঞা কারো নেই। সবাই শুধু ‘কী’ নিয়ে ব্যস্ত, ‘কেন’ নিয়ে নয়।”

বৃষ্টির শব্দে লাইব্রেরি ঘরটা এখন এক গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। কাকু আবার বলতে শুরু করলেন, “অথচ আমাদের বিড়ম্বনা দেখো! আমরা সবাই রাকেশ ঝুনঝুনওয়ালার মতো অঢেল সম্পদ চাই, রাধাকৃষ্ণ দামানির মতো সাফল্য চাই, ওয়ারেন বাফেটের মতো জাদুকরী সমৃদ্ধি চাই। কিন্তু আমরা কি একবারও তলিয়ে দেখেছি, এই মানুষগুলো কি টিভি দেখে আজকের এই উচ্চতায় পৌঁছেছেন? ঝুনঝুনওয়ালা টিভি দেখে টাকা কামাননি, বাফেট অন্যের টিপস নিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েননি। তাঁরা যা করেছেন, আমরা ঠিক তার উল্টোটা করতে চাই। আমরা তাঁদের সম্পদকে সন্মান করি, কিন্তু তাঁদের পরিশ্রম আর আদর্শকে পদাঘাত করি।”

কাকুর কথাগুলো যেন আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি বলে চললেন, “আমাদের এই যে মৌলিক ভ্রান্তি, এটাকেই সবার আগে সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। অনেকে কী করে জানো? সূর্য ওঠার সাথে সাথেই ঘরের টেলিভিশনে সিএনবিসি কিংবা অনিল সিংভিদের আসর সাজিয়ে বসে। সন্ধ্যাবেলাও সেই একই মত্ততা। বাড়ির ছোটদের শিক্ষার চেয়েও জরুরি হয়ে পড়ে ‘কোন স্টক ভালো আর কোনটা খারাপ’ সেই গুজবটুকু শোনা। তারা ভুলে যায়, বাজার কোনো খবরের কাগজ নয় যে রোজ সকালে পড়ে তুমি পন্ডিত হয়ে যাবে। বাজার হলো এক নিরন্তর সাধনা, যা ওই মায়া-পর্দার বাইরে নিজের নিভৃত গবেষণায় লুকিয়ে থাকে।”

কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর প্রাজ্ঞ চোখের দৃষ্টি জানলার ওপারে মেঘে ঢাকা পাহাড়ের শিখরে স্থির হয়ে রইল। আমি বুঝলাম, সফল হতে গেলে প্রথমে নিজের মন থেকে ওই ‘শর্টকাট’ আর গুজবের আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করা জরুরি।


টিভি চ্যানেলের বাজার বিশ্লেষক অ্যাঙ্কর ও শেয়ার বাজার

কাকু হঠাৎ আমার খুব কাছে এসে থামলেন। তাঁর দৃষ্টি যেন আমার মগজের গভীরে কোনো এক ধুলোমাখা সত্যকে খুঁজে পেতে চাইছে। তিনি অত্যন্ত ধীর অথচ গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন, “অপূর্ব, তুমি কি একটি অতি সাধারণ অথচ ভয়ংকর তথ্য জানো? ওই যে ঝকঝকে পোশাক পরে টিভির পর্দায় যে অ্যাঙ্কররা মহানন্দে বাজার বিশ্লেষণ করেন, তাঁদের নিজেদের নামে একটি শেয়ার কেনা বা বেচার বিন্দুমাত্র আইনি অধিকার নেই? সেবি (SEBI)-র নিয়মে তাঁদের ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে ট্রেড করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।”

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম। কাকু আবার বলে চললেন, “ভেবে দেখো বিড়ম্বনাটা! আমরা তাঁদের মুখের অমৃতবাণী শুনে বাজারে টাকা ঢালি, যাঁদের নিজেদেরই বাজারে নামার অনুমতি নেই। আমরা সাঁতার শিখতে চাইছি এমন লোকের কাছে, যে কোনোদিন জলেই নামেনি! অপূর্ব, আমরা এক দীর্ঘমেয়াদী ভুল পথে হাঁটছি। গত দশ-বিশ বছর ধরে এভাবেই আমরা প্রতারিত হয়ে আসছি।”

বাইরের অন্ধকার এবার যেন কাকুর কথার প্রতিধ্বনি হয়ে আরও ঘনীভূত হলো। তিনি লাইব্রেরির আলমারি থেকে একটি ধুলোমাখা প্রাচীন বই তুলে নিয়ে বললেন, “টিভি তোমাকে সম্পদ দেবে না অপূর্ব, সম্পদ দেবে শাস্ত্র। এই যে বইগুলো দেখছ, এগুলো সেইসব মানুষের রক্তজল করা অভিজ্ঞতার দলিল, যাঁরা বাজারে সত্যি সত্যি নিজেদের ভাগ্য গড়েছেন। তুমি কি কোনোদিন দেখেছ কোনো টিভি অ্যাঙ্করকে স্টক মার্কেট নিয়ে সার্থক কোনো বই লিখতে? কোথা থেকে লিখবেন? ততটা প্রজ্ঞা আসবে কোত্থেকে?”

কাকু একটু ম্লান হাসলেন। “তাঁদের দোষ দিই না। তাঁরা তো স্রেফ ভাড়াটে সৈনিক। সারাটা দিন ওই তীব্র চাপের মধ্যে চিৎকার করে তাঁরা এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে নতুন করে কিছু পড়ার মতো শক্তি তাঁদের অবশিষ্ট থাকে না। আর সেই ক্লান্তিটা কিসের জানো? অর্ধেক কথা তাঁদের পেছন থেকে শিখিয়ে দেওয়া হয়, কাগজে লিখে দেওয়া হয়। আর সেই মিথ্যেগুলোই তাঁদের প্রতিদিন তোতা পাখির মতো আউড়ে যেতে হয়। ওই ক্লান্তির উৎস হলো, প্রতিদিন হাজার হাজার খুচরো বিনিয়োগকারীকে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে বোকা বানানোর এক অশুভ গ্লানি।”


কমফোর্ট জোন

কাকু এবার আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর হাতের স্পর্শে আজ এক অকাট্য দালিলিক সত্যের ভার। “আমরা কেন তাঁদের মতো হতে পারি না, যাঁরা সত্যি সত্যি সফল? কারণ তাঁদের নকল করাটা আমাদের এই আরামপ্রিয় মৌলিক স্বভাবের একদম বিরোধী। যারা বাজারে টাকা কামায়, তারা শনি-রবিবার সিনেমা দেখে সময় নষ্ট করে না। তারা সস্তা বিনোদনের বদলে ব্যবহারিক সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে।”

একটু থেমে তিনি বললেন, “সাফল্যের পথটা বড়ই কণ্টকাকীর্ণ অপূর্ব। যে মানুষটা আজ বাজারে সফল, সে পকেটে দামী মোবাইল ফোন রাখার বদলে সেই টাকায় শেয়ার কেনা বেশি পছন্দ করে। সে বছরের ছুটিতে বিলাসিতার টানে বিদেশে ওড়ার বদলে সেই পুঁজিকে বাজারে খাটানোকে শ্রেয় মনে করে। আর আমরা? আমরা ফলটা চাই, কিন্তু সেই কৃচ্ছ্রসাধনটুকু করতে চাই না। আমরা আমাদের অভ্যাস বদলাতে ভয় পাই বলেই তাঁদের অনুসরণ করতে পারি না। আসলে নিজেকে পরিবর্তন না করলে ওই ১ শতাংশের দলে নাম লেখানো অসম্ভব।”

কাকু আবার জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমি স্তব্ধ হয়ে ভাবছিলাম, আমরা যাকে আধুনিকতা আর স্মার্টনেস বলে ভাবি, তা আসলে সফল হওয়ার পথে সবথেকে বড় অন্তরায়। নিজের অভ্যাসকে বলি না দিলে যে এই যজ্ঞের পূর্ণাহুতি সম্ভব নয়, তা আজ কাকুর প্রতিটি শব্দে স্পষ্ট হয়ে উঠল।


সামাজিক ইকোসিস্টেম - কর্মচারী তৈরির কারখানা

বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর লাইব্রেরি ঘরের ধূপের গন্ধের মাঝে কাকুর দীর্ঘশ্বাসটা যেন এক গভীর সত্যের সংকেত দিল। তিনি ধীরপদে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, তারপর শান্ত স্বরে বললেন, “অপূর্ব, আমরা যে প্রতিষ্ঠানগুলোয় পড়ে বড় হয়েছি, সেগুলো আমাদের কী শিখিয়েছে জানো? কেবল এক স্তরের ‘কর্মচারী’ হতে। কেন? কারণ যাদের কাছে আমরা পাঠ নিয়েছি, তাঁরা নিজেরাই যে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন না। খুব অপ্রিয় হলেও সত্যিটা হলো, যে শিক্ষক আজ সপ্তম শ্রেণির শিশুকে পড়াচ্ছেন, তিনি যদি কোনো বহুজাতিক সংস্থায় লক্ষ টাকার বেতনের চাকরি পেতেন, তবে তিনি কি আর শিক্ষকতা করতেন? করতেন না।”

কাকু একটু থামলেন। তাঁর মুখে এক বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। “এই ইকোসিস্টেম বা সমাজ-ব্যবস্থাকে এক দিনে পরিবর্তন করা যাবে না অপূর্ব। আমাদের সন্তানদেরও একই বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তবে সমাধান কি নেই? নিশ্চয়ই আছে। তারা স্কুলে যা শিখছে, শিখুক। কিন্তু ‘ব্যবহারিক জীবন’ শেখানোর দায়িত্বটুকু আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত আধ ঘণ্টা সময় বার করে সন্তানদের সাথে বসতে হবে। ঠিক যেমন আমরা কোনোদিন আহার করতে ভুলি না, তেমনি এই সময়টুকুও যেন ভুল না হয়। আর জানো তো? অন্যকে শেখানোর ছলে আমাদের নিজেদেরই জীবনদর্শন ঝালিয়ে নেওয়া হয়, আমরা নিজেরাই ভেতরে ভেতরে শক্তিশালী হয়ে উঠি।”

কাকু লাইব্রেরির এক কোণে রাখা রাধাকৃষ্ণ দামানি-র একটি ছবির দিকে ইঙ্গিত করলেন। “অপূর্ব, ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সফল এই মানুষটি, যিনি কিংবদন্তি রাকেশ ঝুনঝুনওয়ালার মেন্টর বা গুরু। তিনি কিন্তু একজন সাধারণ স্নাতকও নন। অথচ শেয়ার বাজারের এই রণক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বড় সেনাপতি আজ পর্যন্ত কেউ জন্মেছে কি? এখানেই একাডেমিক শিক্ষা আর বাজারের বুদ্ধির তফাত। শেয়ার বাজার কোনো জটিল থিওরি বা কম্পিউটারের অ্যালগরিদম বোঝে না, ও বোঝে কেবল তোমার ‘মানসিকতা’ বা মাইন্ডসেট।

কাকুর চোখের দৃষ্টি এবার আরও তীক্ষ্ণ হলো। তিনি জোর দিয়ে বললেন, “৯৯ শতাংশ লোক কী ভুল করছে, সেটা বোঝা খুব সহজ। তারা সবাই টিভির পর্দায় চোখ রেখে বসে আছে, খবরের কাগজ পড়ে ভাবছে তারা খুব ‘স্মার্ট’ হয়ে উঠছে। অথচ তারা স্রেফ অন্যের মতামত গিলছে। আমি বলি, টিভিতে কোনো কিছুই দেখা উচিত নয়। ওই উদ্দাম নাচ, অর্থহীন সঙ্গীত কিংবা চটকদারি পোশাক কি তোমার পকেটে টাকা এনে দেবে? বরং ওগুলো তোমার চরিত্র আর সময় দুটোকেই তিলে তিলে ধ্বংস করবে।”


ফেরারি, রোলস রয়স, ল্যাম্বরগিনির  বিজ্ঞাপন টিভিতে কোনোদিন আসে না

কাকু টেবিলের ওপর থেকে একটি কলম তুলে নিলেন। “সিনেমা আমাদের কী শেখায়? বন্দুক চালানো, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, নেশা করা কিংবা কলুষিত সম্পর্ক। এগুলো দেখে আমাদের চরিত্রও নিচে নামে, আবার সম্পদও নষ্ট হয়। একটি কথা সবসময় মনে রেখো অপূর্ব। ফেরারি, রোলস রয়স কিংবা ল্যাম্বরগিনির মতো দামী গাড়ির বিজ্ঞাপন টিভিতে কোনোদিন আসে না। কেন জানো? কারণ যাদের এই গাড়িগুলো কেনার সামর্থ্য আছে, তারা কোনোদিন টিভির সামনে বসে সময় নষ্ট করে না।”

লাইব্রেরি ঘরের সেই নিস্তব্ধতায় কাকুর প্রতিটি কথা যেন আমার মগজে হাতুড়ির মতো ঘা দিচ্ছিল। আমি অনুভব করলাম, সফল হওয়াটা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং তা হলো নিজের অভ্যাস আর রুচিকে পরিশুদ্ধ করার এক সুদীর্ঘ লড়াই। কাকুর গম্ভীর কণ্ঠস্বর যখন থেমে এল, তখন বাইরে বৃষ্টির শব্দও যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে স্তিমিত হয়ে এসেছে।

কাকু একটু থামলেন। তাঁর হাসিতে এক অদ্ভুত তুচ্ছতা। “শাহরুখ খান কোন সিনেমা বানালেন কিংবা কোন তারকা কিসের হয়ে গান গাইলেন, তাতে ওই সফল মানুষগুলোর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তারা ওই তারকাদের দেখেন কেবল এক নগণ্য দৃষ্টিতে; তারা দেখেন, কাকে দিয়ে অভিনয় করালে তাদের পণ্য বাজারে বেশি বিক্রি হবে। ব্যস! অর্থাৎ, তুমি যাদের দেখে মুগ্ধ হও, তারা ওই ১ শতাংশ মানুষের কাছে স্রেফ এক একজন বেতনভোগী কর্মচারী ছাড়া আর কিছুই নয়।”

আমি বিস্ময়ে কাকুর দিকে চেয়ে রইলাম। তিনি বলে চললেন, “অপূর্ব, এবার থেকে তোমার এই মুগ্ধতার লক্ষ্যটা বদলে ফেলো। যখন শোনো যে কোনো ছেলের এক কোটি টাকার প্যাকেজে চাকরি লেগেছে, তখন ওই ছেলেটিকে দেখে মুগ্ধ হয়ো না। বরং ভাবো, সেই মানুষটি কেমন, যে অনায়াসে এক কোটি টাকার প্যাকেজ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? ওই ছেলেটিকে দেখে নয়, বরং ওই কোম্পানি আর তার স্রষ্টাকে নিয়ে পড়াশোনা করো। তাঁর সাক্ষাৎকার পড়ো, তাঁর মস্তিষ্কের গঠন বোঝার চেষ্টা করো।”


যা ভাববে তাই পাবে - The Law of Universe

বাইরে মেঘের গর্জন উঠল। কাকুর কথাগুলো যেন সেই গর্জনের সাথেই পাল্লা দিচ্ছে। “তুমি যা ভাববে, যা নিজের হৃদয়ে লালন করবে মহাবিশ্ব তোমাকে ঠিক তাই ফিরিয়ে দেবে। তুমি যদি ১০০ কোটি টাকার কথা ভাবো, তবে তোমার জীবনে সেই ১০০ কোটি উপার্জনের পথ আর কারণগুলো তৈরি হতে থাকবে। আর তুমি যদি কেবল হোম-লোন আর ইএমআই-এর (EMI) চিন্তায় ডুবে থাকো, তবে তোমার জীবন ঋণের জালেই আটকে থাকবে। মনে রেখো, তুমি যেখানে তোমার মনোযোগ দেবে, তোমার নিয়তি ঠিক সেদিকেই ধাবিত হবে।”

কাকু এবার অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেলেন। তাঁর স্বরে এখন এক সতর্কবার্তা। “অপূর্ব, সতর্ক থেকো। তুমি যদি সারাদিন ‘স্টপ-লস’ (Stop-loss) নিয়ে ভাবো, তবে তোমার জীবনে কেবল লোকসানই আসবে। আর যদি একবার ওই ‘এফএন্ডও’ (F&O) বা ডেরিভেটিভ বাজারের নেশায় পড়ো, তবে জানবে সেটা কোকেন বা আফিমের চেয়েও ভয়াবহ মাদক। এটা একবার কারো রক্তে মিশলে আর সহজে বেরোতে চায় না। এটা একটা মারণ আসক্তি।”


নিয়তি ও ভাগ্য

কাকু ধীরপদে পায়চারি করতে করতে বললেন, “অপূর্ব, তবে আমাদের বর্জনীয় তালিকাটা ঠিক কী? খুব সহজ। না দেখা উচিত টেলিভিশন, না খবরের কাগজ, না ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রাম। এমনকি দিনভর ওই ইউটিউব বা টুইটারের মায়াজালে ডুবে থাকাও এক প্রকার আত্মহনন। আমি তোমাকে সেই ১ শতাংশ মানুষের জগতে নিয়ে যেতে চাই, যারা ওই ৯৯ শতাংশকে প্রতিনিয়ত হারিয়ে দিয়ে বিশাল অর্থ উপার্জন করছে। তুমি হয়তো বলবে তারা ভাগ্যবান? হ্যাঁ, আমি অস্বীকার করছি না। তারা ভাগ্যবান, তারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত। কিন্তু জানো তো অপূর্ব, এই ‘ভাগ্য’ শব্দটার ওপর ১০০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ তোমার নিজের হাতে!”

আমি বিস্ময়ে কাকুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “ভাগ্য গড়া বা ভাঙা ঠিক ততটাই সহজ যতটা নিজের স্বাস্থ্য গড়া। তুমি দু’দিন চিনি না খেয়ে দেখো, প্রতিদিন চার লিটার জল পান করো। দেখবে তোমার শরীর বদলে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি, প্রতিদিন আধঘণ্টা ঈশ্বরচিন্তা বা জপ করো, বড়দের সম্মান করো, পথে আইন মেনে চলো আর অফিসে সবার সাথে বিনয়ী ব্যবহার করো। তারপর ভেবে দেখো তো, তোমার ফলাফল ভালো হবে না খারাপ? ভাগ্য আর কিছুই নয় অপূর্ব, ভাগ্য হলো তোমার নিজেরই কর্মের এক অনিবার্য ফল। ব্যস!”

কাকু এবার আমার খুব কাছে এসে এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে তখন এক চিরন্তন প্রজ্ঞা। “মানুষ বলে প্রারব্ধ বা পূর্বজন্মের ভাগ্যের কথা। কিন্তু জানবে, বর্তমান জীবনে তার ভূমিকা ১০ শতাংশের বেশি নয়। বিশেষ করে তোমার বয়স যখন কুড়ি ছাড়িয়ে গেছে। কারণ গত কুড়ি বছরে তুমি যা যা করেছ, তা তোমার সমস্ত ইতিহাসকে ওলটপালট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অথচ আমাদের ট্র্যাজেডি দেখো! আমরা সেই জন্মের সময়কার রাশিফল বা জন্মপত্রিকা নিয়ে জ্যোতিষীর দ্বারে দ্বারে ঘুরি। সেই জন্মপত্রিকা তো আজ বাসি হয়ে গেছে অপূর্ব! ওই নক্ষত্ররা যেখানে বসে ছিল সেখানেই আছে, কিন্তু গত কুড়ি-ত্রিশ বছরে তোমার কর্মের কোনো ‘আপডেট’ সেখানে নেই।”

কাকু একটা রহস্যময় হাসি হাসলেন। “তিরিশ বছর বয়সে জ্যোতিষীর কাছে যাওয়াটা আসলে এক মূর্খামি। যে সিলেবাস তিরিশ বছরের পুরনো, তা দিয়ে কি বর্তমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়? তুমি যদি দিনে মাত্র ১৫ মিনিটও নিষ্ঠাভরে জপ করতে বা নিজেকে গড়তে ব্যয় করতে, তবে গ্রহ-নক্ষত্রের ওই কুপ্রভাব তুমি কবেই বদলে দিতে পারতে। আমরা কেন বুঝি না যে, নিজের ভাগ্যকে প্রতিদিন আপডেট করার দায়িত্বটা বিধাতা আমাদের হাতেই দিয়ে রেখেছেন!”

বাইরে তখন বৃষ্টির ছন্দ বদলে গেছে, যেন প্রকৃতির কোনো গূঢ় সত্য কাকুর কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছিলাম। জীবন আর বাজারের এই সমীকরণ যে এত গভীর হতে পারে, তা আমার কল্পনারও অতীত ছিল।


জীবনের ওনারশিপ

কাকু টেবিলের ওপর হাত রেখে ঝুঁকে বসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এখন অনেক বেশি ঋজু। “অপূর্ব, একটা কথা মনে রেখো। শেয়ার বাজারে কৌশল শেখানো আমার জন্য মাত্র একটি বিকেলের কাজ। কিন্তু সেই কৌশলের ফল তুমি তখনই পাবে, যখন তোমার জীবনের মৌলিক ভিতগুলো পরিষ্কার হবে। মানুষ কেন ভয় পায় জানো? কারণ তারা অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের দায় এড়াতে চায়। অথচ সত্যিটা হলো, তোমার জীবনে যা ঘটছে, তার জন্য তুমি এবং একমাত্র তুমিই দায়ী। ‘টাকার অভাবে পড়তে পারিনি’ কিংবা ‘বস ভালো নয় বলে চাকরিটা গেল’ - এগুলো স্রেফ আত্মপক্ষ সমর্থনের অজুহাত।”

বাইরে বৃষ্টির বেগ কমে এসেছে, কিন্তু কাকুর কথার তেজ কমেনি। তিনি বললেন, “বিনিয়োগের জগতে সফল হতে গেলে তোমাকে দুটো কাজ একসাথে করতে হবে। ঠিক যেমন শরীর ভালো রাখতে গেলে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর খাবারও ছাড়তে হয়। তুমি করলার রসও খেলে আবার টপাটপ লেডিকেনিও মুখে পুরলে! তাতে কোনো কাজ হবে না। ওই ৯৯ শতাংশ মানুষ কী করে? তারা টিভি দেখে, খবরের কাগজ পড়ে, আর নিজের বিনিয়োগের কথা দশজনের সাথে আলোচনা করে। কিন্তু যারা আসল খেলোয়াড়, তারা কখনোই নিজের কৌশল নিয়ে বাইরে কথা বলে না। তারা শান্তভাবে নিজেদের পথে এগিয়ে যায়।”


নিউজ ও ওপিনিয়ন এক নয়

কাকু এবার এক অমোঘ পার্থক্যের কথা বললেন। “অপূর্ব, খবর (News) আর মতামতের (Opinion) মধ্যে যে বিস্তর তফাত আছে, সেটা কি জানো? যা ইতিমধ্যে ঘটে গেছে, যা অতীত সেটাই হলো খবর। আর যা ভবিষ্যতে হতে পারে, যার স্রেফ সম্ভাবনা আছে, সেটা খবর নয়, সেটা কারো ব্যক্তিগত মতামত। কালকের তাপমাত্রা কত হবে তা জানাটা একটা অনুমান, কিন্তু আজকের তাপমাত্রা কত ছিল সেটা হলো খবর। খবর সবসময় ১০০ শতাংশ সঠিক এবং অপরিবর্তিত হয়।”

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছিলাম। কাকু এবার একটা পুরোনো ডায়েরিতে কিছু একটা লিখলেন। “খবর যদি পড়তেই হয়, তবে বাজে উৎসে সময় নষ্ট করো না। ‘Screener.in’-এর মতো ওয়েবসাইট দেখো, যেখানে এনএসই (NSE) বা বিএসই (BSE)-তে জমা পড়া কোম্পানির প্রকৃত তথ্যগুলো থাকে। তাদের ত্রৈমাসিক ফলাফল, তাদের পেশ করা ‘পিপিটি’ এগুলোই হলো আসল সত্য, কারণ এগুলো ঘটে গেছে। আর খবরের কাগজের মধ্যে কেবল ‘ইকোনমিক টাইমস’ (Economic Times) দেখাই যথেষ্ট। দশটা ওয়েবসাইট চটকালে কেবল সময় আর শক্তির অপচয় হয়। মনে রেখো অপূর্ব, সফল মানুষেরা ভিড় এড়িয়ে চলে, তারা তথ্যের জঞ্জাল থেকে সত্যের মুক্তো খুঁজে নিতে জানে।”

কাকু তাঁর হাতের তর্জনী তুলে ধরলেন, যেন কোনো এক মহাজাগতিক সূত্রের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তিনি বললেন, “অপূর্ব, যেকোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের বরপুত্র হতে গেলে তিনটে জিনিসের নিখুঁত আহুতি প্রয়োজন। সময়, মনোযোগ আর শক্তি। এই ত্রিবেণী সঙ্গম যদি না ঘটে, তবে সাফল্য মরীচিকা হয়েই থাকবে। হয়তো তুমি সময় দিচ্ছ, শক্তিও লাগাচ্ছ, কিন্তু মনোযোগ অন্য কোথাও - ফল আসবে শূন্য। আবার তুমি মনোযোগ দিলে, সময়ও দিলে, কিন্তু তোমার শরীর আর মন ক্লান্ত - শক্তি নেই। জানবে, সেখানেও ব্যর্থতা নিশ্চিত। টানটান মনোযোগ আর পূর্ণ শক্তির সাথে সময়ের বিনিয়োগই হলো বিজয়ী হওয়ার একমাত্র পথ।”

কাকু একটু থামলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। “জানো অপূর্ব, আমাদের এই মহামূল্যবান প্রাণশক্তি সবচেয়ে বেশি কোথায় অপচয় হয়? এর প্রধান উৎস হলো সিনেমা দেখা আর তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে পরচর্চা করা। এই দুটো অভ্যাস মানুষের ভেতরের তেজকে নিঃশেষ করে দেয়, তাকে একপ্রকার দেউলিয়া করে ছাড়ে। আর সেই ক্লান্তির পর নতুন কিছু শেখার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।”

বাইরে অন্ধকারের বুক চিরে একটা দমকা হাওয়া দিয়ে গেল। কাকু বলে চললেন, “তথ্যের জঞ্জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করো। খবরের জন্য কেবল ইকোনমিক টাইমস আর স্ক্রীনার (screener.in) দেখো। মনে রেখো, ইকোনমিক টাইমস তোমাকে ব্যবসার খবর দেবে, আর স্ক্রীনার তোমাকে দেবে আর্থিক খতিয়ান। আর যদি দামের গতিবিধি বা ‘প্রাইস অ্যাকশন’ বুঝতে হয়, তবে চার্টের ওপর ভরসা করো। ৯৯ শতাংশ মানুষ এই খেলায় হেরে যায় কারণ তারা প্রকৃতির অমোঘ নিয়মটা বোঝে না। গ্রীষ্মের পর যে শীত আসে আর পতনের পর যে উত্থান অনিবার্য এই ধ্রুব সত্যটুকু গ্রহণ করার মতো ধৈর্য তাদের নেই।”


শেয়ারের দাম ও মানুষের মানসিকতা

কাকু এবার টেবিলটা মৃদু চাপড়ে বললেন, “অপূর্ব, সাধারণ মানুষের বুদ্ধি বড়ই বিচিত্র! যখন কোনো শেয়ারের দাম আকাশছোঁয়া হয়, তখন তারা লোভে পড়ে কেনে আর মনে মনে আনন্দ পায়। আর যখন টিসিএস-এর মতো মজবুত কোম্পানির দাম ৩০ শতাংশ পড়ে যায়, তখন তারা ভয়ে কঁপতে থাকে। অথচ যারা আসল জহুরি, তাদের কাছে এই পতনই হলো উৎসবের সময়। কারণ তাঁরা জানেন শেয়ারের সাময়িক দামের ওঠা-পড়া কখনোই ব্যবসার আসল রূপকে প্রতিফলিত করে না।”

আমি বিস্ময়ে কাকুর দিকে চেয়ে রইলাম। তিনি বলে চললেন, “বুঝতে শেখো অপূর্ব, যেদিন কোনো শেয়ারের দাম ৫ শতাংশ পড়ে গেল, সেদিন কিন্তু ওই কোম্পানির খদ্দেররা পালিয়ে যায়নি, কিংবা সেদিনই কোনো বিশাল কেলেঙ্কারি ঘটেনি। আবার যেদিন দাম হু হু করে বাড়ল, সেদিনই যে কোম্পানি নতুন কোনো লাভের মুখ দেখল তাও নয়। শেয়ারের দামের গতিবিধি আসলে একদল মানুষের কেনা-বেচার উন্মাদনা মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে হয়তো লাভ আর দামের একটা সম্পর্ক থাকে, কিন্তু স্বল্পমেয়াদে তারা দুই মেরুর বাসিন্দা। হয়তো তিন বছর দাম থমকে রইল আর শেষ দু-বছরে সবটুকু হিসাব মিটিয়ে দিল। এমনটাই বাজারের রীতি।”

কাকু টেবিলের ওপর দু-হাত রেখে আমার দিকে ঝুঁকে বসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে এখন এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। তিনি বললেন, “অপূর্ব, আমরা কী করি? স্টক প্রাইস যখন ঊর্ধ্বমুখী, আমরা কোম্পানিকে দেবতা জ্ঞান করি। আর যখনই সেই দাম নামতে শুরু করে, আমাদের কাছে কোম্পানিটা রাতারাতি অস্পৃশ্য হয়ে যায়। এই যে হুজুগ, ৯৯ শতাংশ মানুষ যারা বাজারে রিক্তহস্তে ফেরে, তারা এই চক্রেই বন্দি।”

কাকু তাঁর ডায়েরিতে বড় বড় অক্ষরে দুটি পয়েন্ট লিখলেন। “জানবে অপূর্ব, শেয়ার বাজারে টাকা হারানোর সবচেয়ে বড় দুটো কারণ আছে। এক নম্বর হলো ‘স্টপ লস’। এই বস্তুটা আজ পর্যন্ত কাউকে ধনী হতে দেয়নি। জগতের হাতেগোনা দু-একজন বিলিয়নিয়ার ছাড়া আর কেউ স্টপ লস ব্যবহার করেন না। আর যাঁরা করেন, তাঁরা মানুষ নন, তাঁরা আসলে শৃঙ্খলার এক একটি রোবট। আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষের জন্য ওই কৌশল নয়।”

তিনি একটু থামলেন, তারপর চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় পয়েন্টটি উচ্চারণ করলেন। “আর দ্বিতীয় কারণটি হলো, দামের সাথে কোম্পানির চরিত্রকে গুলিয়ে ফেলা। দামের পতন মানেই কোম্পানির মরণ - এর চেয়ে বড় বোকামি আর কিছুই হতে পারে না। যখন দাম ভালো, তখন কোম্পানি ভালো; যখন দাম খারাপ, তখন কোম্পানি খারাপ! এটা কি কোনো বিচার হলো? আমাদের যেতে হবে মূল শিকড়ে, বুঝতে হবে সেই ‘কেন’র কারণগুলো।”

কাকু এবার একটা উদাহরণ টেনে আনলেন। “মনে করো কোনো এক উৎপাদনকারী কোম্পানি। হঠাত দেখা গেল তাদের নিট লাভ বা নেট প্রফিট কমে গেছে। সাধারণ লোকে চিৎকার শুরু করবে, ‘সর্বনাশ হলো! কোম্পানি ডুবল!’ কিন্তু তুমি যদি জহুরি হও, তবে দেখবে কেন এমনটা হলো। উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোতে লাভ ওঠানামা করে কাঁচামালের দামের ওপর। ধরো সেই হাওয়াই চপ্পল কিংবা টায়ার তৈরির কোম্পানি। সেখানে রাবার লাগে, আর লাগে খনিজ তেল বা ক্রুড অয়েল।”

বাইরে অন্ধকারের বুক চিরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কাকু বলে চললেন, “ক্রুডের দাম বিশ্ববাজারে বাড়লে তার প্রভাব এসে পড়ে ভারতীয় মুদ্রায়। ফলে কাঁচামাল মহার্ঘ হয়ে যায়। ওদিকে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এবার ভেবে দেখো, কাঁচামাল দামি হলো, সুদের হার বাড়ল, আর সাধারণ মানুষের হাতে টাকা কম থাকায় গাড়ির চাহিদাও কমে গেল। ফলে টায়ারের বিক্রিও কমে গেল। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীর বেতন কি কমল? বিদ্যুতের বিল কি কমল? না, নির্দিষ্ট খরচগুলো তো একই রইল।”

কাকু একটি মৃদু হাসি হাসলেন। “বিক্রি কমলো, কিন্তু খরচ কমলো না।ফলস্বরূপ সেই ত্রৈমাসিকে কোম্পানির লাভ হয়তো অর্ধেক হয়ে গেল। ব্যস! হুজুগে বাঙালি থেকে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ। সবাই গলা ফাটিয়ে বলবে, ‘এমআরএফ শেষ হয়ে যাবে, অ্যাপোলো টায়ার ধুলোয় মিশবে!’ তারা কি ভাবে মানুষ এরপর চাকায় বেলুন ফুলিয়ে গাড়ি চালাবে? তারা কারণটা বোঝে না যে এটা একটা সাময়িক চক্র মাত্র।”

কাকু ল্যাপটপটা বন্ধ করে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। “অপূর্ব, যে লাভ কমার কারণ বুঝতে পারে না, সে বাজারের গতিও কোনোদিন বুঝতে পারবে না। ৯৯ শতাংশ মানুষ ওই ওপর ওপর ভেসে থাকা দামটুকু দেখেই বিচার সারে। কিন্তু ১ শতাংশ মানুষ জানে, যেখানে অন্ধকার সবথেকে ঘন, ভোরের আলো সেখান থেকেই ফুটে ওঠে।”

কাকু তাঁর হাতের গ্লাসটা সশব্দে টেবিলে রাখলেন। “অপূর্ব, তুমি কি ভাবো এই নিগূঢ় সত্যগুলো টিভিতে কেউ এসে বলবে? কক্ষনো না! তারা তো পরোয়াও করে না। বরং যখন বাজার নিচে নামে, তখন তারা ভয়ের পরিবেশ আরও উসকে দেয়। যাতে সাধারণ মানুষ সস্তায় তাদের সম্পদ ছেড়ে পালায় আর বড় খেলোয়াড়রা সেই সুযোগে নিজেদের ঝুলি ভরে নিতে পারে। অথচ সাধারণ মানুষের বোঝা উচিত ছিল, যখন মুদ্রাস্ফীতি শিখরে পৌঁছায় আর চাহিদা কমতে শুরু করে, তখনই তো পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলে।”

কাকু একটু ঝুঁকে এলেন আমার দিকে। “মনে রেখো, যেখানে ৯৯ শতাংশ মানুষ হুজুগে পড়ে কেনে, আমাদের সেখানে বিক্রি করতে হবে। আর যেখানে তারা ভয়ে বিক্রি করে পালাবে, আমরা ঠিক সেখানেই কেনার সাহস দেখাব। এটাই বাজারে টিকে থাকার এবং জেতার একমাত্র অমোঘ পথ। সাধারণ জনতা যা করছে, চোখ বুজে তার ঠিক উল্টোটা করাই হলো সাফল্যের বীজমন্ত্র।”

বাইরের অন্ধকার এবার যেন এক গভীর দর্শনে ডুবে গেল। কাকু বলে চললেন, “তুমি কি কখনো দেখেছ মুদ্রাস্ফীতি চিরকাল শিখরে বসে আছে? এমনটা হয় না। কারণ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের নিজের স্বার্থ। সরকার জানে, মুদ্রাস্ফীতি বাগে না আনলে পরের নির্বাচনে গদি উল্টে যাবে। সুতরাং, যাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ আছে, তারা কোনো না কোনো নীতি এনে বাজারকে শান্ত করবেই। ঠিক একইভাবে, স্টক মার্কেট যাদের নিয়ন্ত্রণে, তাদের স্বার্থেই বাজারকে উপরে উঠতে হয়। বাজার সাময়িকভাবে নিচে যেতে পারে, কিন্তু নিচে পড়ে থাকতে পারে না।”


মার্কেট লিডার শেয়ারে করেকশন : ভয় নাকি সুযোগ?

কাকু এবার একটা মোক্ষম উদাহরণ দিলেন। “অপূর্ব, যখন টিসিএস, ইনফোসিস, রিলায়েন্স বা বাজাজ ফাইন্যান্সের মতো জায়ান্টরা ২৫-৩০ শতাংশ নিচে আসে, তখন কেন আমরা কিনি না? কারণ তখন আমাদের মনে এক বিচিত্র ভয় কাজ করে। আমরা ভাবি, এগুলো আর বুঝি উপরে উঠবে না! যেমন এখন বাজারে কান পাতলে শোনা যায়, আদিত্য বিড়লা গ্রুপের গ্রাসিম পেইন্ট ব্যবসায় আসছে বলে এশিয়ান পেইন্টস নাকি এবার ধুলোয় মিশবে! কী বিচিত্র ধারণা!”


TradingView চার্টে Asian Paints শেয়ারের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচিত্র যেখানে শিখর থেকে প্রায় ৩৩ শতাংশ পতন দেখা যাচ্ছে
Asian Paints শেয়ারের দীর্ঘমেয়াদি চার্টে বড় করেকশন — শিখর থেকে প্রায় ৩৩% পতন

কাকু হেসে উঠলেন। “ভাবখানা এমন যে, স্কুলের প্রিন্সিপালকে রাতারাতি বাইরে বের করে দিয়ে দপ্তরিকে প্রধান শিক্ষক বানিয়ে দেওয়া হবে! যারা আজীবন এশিয়ান পেইন্টসের এজেন্সিতে ব্যবসা করল, তারা কি কাল সকালেই সব ছেড়েছুঁড়ে গ্রাসিমের মাল বিক্রি শুরু করবে? আর আমিই বা আমার ঘরের দেয়ালে পরীক্ষা করতে যাব কেন? আমি তো সেই এশিয়ান পেইন্টসেই ভরসা রাখব। বাজাজ ফাইন্যান্স নিয়েও লোকে একই ভুল করছে রিলায়েন্স এই ব্যবসায় আসছে বলে। রিলায়েন্স আসছে মানে কি মানুষ বাজাজের কিস্তি মেটানো বন্ধ করে দেবে? তাদের কার্ড ছিঁড়ে ফেলবে? অসম্ভব!”

কাকু আঙুল উঁচিয়ে অমোঘ সত্যটি উচ্চারণ করলেন। “মনে রেখো অপূর্ব, যে মার্কেট লিডার, সে অকারণে লিডার হয়নি। দশ বছর ধরে রাজত্ব করার যোগ্যতা তার রক্তে আছে। বিরাট কোহলি কি হঠাৎ খেলা ভুলে যাবে আর পাড়ার গলির ছেলেটা এসে চার-ছক্কা মেরে বিশ্বজয়ী হবে? আমরা কি কোহলির ওপর বাজি ধরা ছেড়ে সেই নবাগত ছেলের ওপর ভরসা করব? সাধারণ মানুষের এটাই সবচেয়ে বড় ভুল। তারা অভিজ্ঞতার পাহাড়কে উপেক্ষা করে মরীচিকার পেছনে ছোটে।”

লাইব্রেরি ঘরের ঘড়িতে তখন টিকটিক শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। কাকুর প্রতিটি কথা যেন আমার মগজের পুরোনো জং ধরা তালাগুলো এক এক করে খুলে দিচ্ছিল।


TradingView চার্টে Exide Industries শেয়ারের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচিত্র যেখানে শিখর থেকে প্রায় ৪৫ শতাংশ পতন দেখা যাচ্ছে
Exide Industries শেয়ারের দীর্ঘমেয়াদি চার্টে বড়সড় পতন — শিখর থেকে প্রায় ৪৫% করেকশন

কাকু তাঁর চেয়ার ছেড়ে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে বৃষ্টির রেশ এখন প্রায় নেই, মেঘের আড়াল থেকে একটা স্থির জ্যোতিষ্ক দেখা যাচ্ছে। তিনি বললেন, “অপূর্ব, ইলেকট্রিক ভেহিকলস বা বৈদ্যুতিক গাড়ির উন্মাদনা দেখে এখন হুজুগে মানুষ কী বলছে জানো? তারা বলছে নতুন নতুন কোম্পানি ব্যাটারি বানাবে, আর এক্সাইডের (Exide) মতো ৪০ বছরের পুরনো মহীরুহরা নাকি ধুলোয় মিশবে! কী অদ্ভুত নির্বুদ্ধিতা! যে প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক দশক ধরে ব্যাটারির নাড়িভুঁড়ি চেনে, তারা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? এটাই হলো ৯৯ শতাংশ মানুষের সাধারণ ভুল, আর এই কারণেই তারা সারাজীবন ‘সাধারণ’ হয়েই থেকে যায়।”


গরিবের স্বভাব ধনীদের গালি দেওয়া

কাকু আমার দিকে ফিরে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিলেন। “মনে রেখো অপূর্ব, সাধারণের কাতার থেকে উচ্চশ্রেণীতে যেতে হলে তোমার চিন্তাভাবনাকেও হতে হবে অভিজাত। ধনী ব্যক্তিদের গালিগালাজ করে কেউ কোনোদিন ধনী হতে পারেনি। তুমি যদি আম্বানি, আদানি, টাটা বা বিড়লাদের ঘৃণা করো, তবে সমৃদ্ধি তোমার কাছে আসবে কেন? তাঁদের সম্মান করতে শেখো, কারণ আজ এই মুহূর্তে তোমার দেশ যে স্বাধীন এবং অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত, তার মূলে রয়েছেন ওই পুঁজিবাদীরাই। যাঁদের কারখানায় কাজ কর হাজার হাজার মানুষের ঘরে উনুন জ্বলে, তাঁদেরকে আমরা চোর অপবাদ দিই? যে দেশ থেকে পুঁজিবাদী আর শিল্পপতিরা শেষ হয়ে গেছে, সেই দেশগুলো আজ ইরান, সিরিয়া, পাকিস্তান কিংবা উত্তর কোরিয়া হয়ে গেছে। মনে রেখো, শিল্পপতিরাই দেশের স্বাধীনতার বর্ম।”


আর্থিক সক্ষমতা ও বাজার

কাকু এবার টেবিলের ওপর রাখা ভারতের ম্যাপটার দিকে হাত রাখলেন। তাঁর স্বরে এখন এক অপ্রতিরোধ্য দৃঢ়তা। “অপূর্ব, তোমার মনে যে ভয়টা কাজ করে, বাজার নিচে গেলে কি আর উপরে ফিরবে? আমি তোমাকে ১০০ শতাংশ গ্যারান্টি দিয়ে বলছি! আগামী ২০ বছর ভারতের বাজার যদি নিচে নামে, তবে তা আরও বৃহত্তর উচ্চতা স্পর্শ করার জন্যই নামবে। কেন জানো? কারণ ২০০০ সালেই আমাদের দেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়ে গেছে। ইতিহাসের শিক্ষা বলে, যখনই কোনো দেশের মাথাপিছু আয় ২,০০০ ডলার ছাড়িয়েছে, তা ১০,০০০ ডলার না হওয়া পর্যন্ত থামেনি। আমরা এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই দাঁড়িয়ে আছি। আমরা অন্তত পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাবো।”

তিনি এক অদ্ভুত শান্ত স্বরে বলে চললেন, “আগামী ২০ বছর ভারতের নিজস্ব কোনো কারণে বাজারে বড় পতন আসবে না। এটা তুমি নোট করে রাখতে পারো। তাইওয়ান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার ইতিহাস দেখো। একবার ভিত্তি তৈরি হয়ে গেলে প্রগতির রথ কেউ আটকাতে পারে না। যদি পতন আসেও, তবে তা আসবে বিদেশের কোনো কারণে, যা কোনোমতেই আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা বা আর্থিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিতে পারবে না। সেটা হবে কেবল সাময়িক এক দোদুল্যমানতা।”


তিন পরিবর্তনের দর্শন

কাকু টেবিলের ওপর তিনটি আঙুল রাখলেন। প্রতিটি আঙুল যেন এক একটি অমোঘ সত্যের স্তম্ভ। তিনি বললেন, “অপূর্ব, বাজারে যা কিছু ঘটে, তাকে মোটা দাগে তিনটে পরিবর্তনের ভিড়ে ভাগ করা যায়। এই তিনটে পরিবর্তন বুঝতে পারলেই তুমি গোলকধাঁধায় পথ হারাবে না।”

১. ব্যবসায়িক পরিবর্তন

তিনি প্রথম আঙুলটি দেখিয়ে বললেন, “এক নম্বর হলো, ব্যবসায়িক পরিবর্তন। ধরা যাক, কোনো একটা পণ্যের চাহিদা রাতারাতি কমে গেল কিংবা কোনো নতুন জিনিসের বাজার হু হু করে বাড়তে শুরু করল। এটা হলো ব্যবসার মূল কাঠামোর বদল।”

২. আর্থিক পরিবর্তন

দ্বিতীয় আঙুলটি তুলে তিনি বললেন, “দুই নম্বর হলো, আর্থিক পরিবর্তন। হয়তো সেই শিল্প বা ব্যবসাটা দারুণ, কিন্তু কোনো একটা নির্দিষ্ট কোম্পানি তার সাধ্যের বাইরে ঋণ নিয়ে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলল। কিংবা ঋণের বোঝা কমিয়ে তারা নিজেদের আর্থিক স্বাস্থ্য ফেরালো। এটা হলো কোম্পানির ভেতরকার হিসাবের খেলা।”

৩. শেয়ারের দামের পরিবর্তন

কাকু এবার তাঁর তৃতীয় আঙুলটি তুলে ধরলেন এবং তাঁর চোখে এক বিদ্যুৎচমক খেলে গেল। “আর তিন নম্বরটি হলো, স্টক প্রাইস বা শেয়ারের দামের পরিবর্তন। জানবে অপূর্ব, কোনো কোম্পানির ব্যবসা বা আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে যদি দাম পড়ে, তবে তা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু যদি দেখা যায় ব্যবসা আগের মতোই পাহাড়ের মতো অটল, আর্থিক অবস্থা আগের চেয়েও শক্তিশালী, অথচ শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশ নিচে নেমে গেছে; তবে বুঝবে বিধাতা তোমার সামনে ১০০ শতাংশ মুনাফা করার এক স্বর্গীয় সুযোগ এনে দিয়েছেন!”


বাস্তব উদাহরণ : TCS কেন সুযোগ হতে পারে


TradingView চার্টে Tata Consultancy Services এর শেয়ারের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচিত্র যেখানে অলটাইম হাই থেকে প্রায় ৪১ শতাংশ পতন দেখা যাচ্ছে
TCS শেয়ারের চার্টে বড়সড় করেকশন — অলটাইম হাই থেকে প্রায় ৪১% পতন

আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম। কাকু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। “চলো, একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ দিই TCS। তাদের ব্যবসায় কি কোনো চিড় ধরেছে? না। তাদের আর্থিক স্থিতিতে কি কোনো কম্পন লেগেছে? তাও না। বরং বাস্তব চিত্রটা হলো, ত্রৈমাসিক এবং বার্ষিক, উভয় ভিত্তিতেই তারা তাদের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ বা ‘লাইফটাইম হাই’ মুনাফা অর্জন করেছে। অথচ অবাক কাণ্ড দেখো, এই স্বর্ণখচিত সাফল্যের পরও শেয়ারের দাম তার শিখর থেকে ৪১ শতাংশ নিচে পড়ে আছে! এটাকে কী বলবে অপূর্ব?”

কাকু আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর স্বরে তখন এক অকাট্য বিজয়ীর সুর। “এটা হলো সেই মুহূর্ত, যখন ৯৯ শতাংশ মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে, আর বাকি ১ শতাংশ মানুষ দু-হাত ভরে মা-লক্ষ্মীকে বরণ করে নেয়। ব্যবসা যখন শিখরে আর দাম যখন নিচে - সেটাই হলো সাধারণের কাতার থেকে রাজাসনে বসার মাহেন্দ্রক্ষণ।”


মার্কেট নিচে নামে কিন্তু কেন নিচে থাকতে পারে না?

কাকু ডায়েরির পাতায় একটা বৃত্ত আঁকলেন। মাঝখান দিয়ে একটা দাগ টেনে বৃত্তটাকে দু-ভাগে ভাগ করলেন। তিনি বললেন, “অপূর্ব, আমাদের লক্ষ্য হলো ওই ১ শতাংশের ভিড়ে নিজেদের নাম লেখানো। আমি প্রায়ই বলি স্টক মার্কেট নিচে নামতে পারে, কিন্তু নিচে পড়ে থাকতে পারে না। কেন জানো? এর পেছনে কোনো দৈব শক্তি নেই, আছে স্রেফ এক অমোঘ যৌক্তিক খেলা। এই খেলার খেলোয়াড়দের আগে চিনতে শেখো।”

তিনি বৃত্তের একপাশে লিখলেন ‘শক্তিশালী হাত’ (Strong Hands) এবং অন্য পাশে ‘দুর্বল হাত’ (Weak Hands)। “অপূর্ব, এই একটি পয়েন্ট যদি তুমি আজ ঠিকঠাক বুঝে নাও, তবে বাজারে তোমার ভয় পাওয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা তাত্ত্বিকভাবে জানি যে প্রমোটাররাই শক্তিশালী। কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে সত্যটা অন্য। শক্তিশালী হাতের তালিকায় প্রমোটারদের পাশে থাকে এফআইআই (বিদেশী প্রতিষ্ঠান), ডিআইআই (দেশীয় প্রতিষ্ঠান) এবং এইচএনআই (উচ্চ নেট মূল্যের ব্যক্তি)। যাঁরা রাকেশ ঝুনঝুনওয়ালার মতো বড় মাপের খেলোয়াড়। সেবির নিয়ম অনুযায়ী, যাঁদের কোনো কোম্পানিতে ১ শতাংশের বেশি অংশীদারিত্ব আছে, তাঁরাই হলেন এই গোত্রের নায়ক।”

কাকু কলমটা ঘুরিয়ে বললেন, “এখন এই শক্তিশালী হাতগুলোকে আবার দু-ভাগে ভাগ করো। বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ী। প্রমোটার বা নরওয়ের কোনো পেনশন ফান্ডের মতো বড় বিনিয়োগকারীরা রোজ কেনা-বেচা করেন না, তাই দামের ওঠানামায় তাঁদের হাত নেই। দামের মুভমেন্ট তৈরি করে ট্রেডাররা। যাঁরা এফআইআই, ডিআইআই বা এইচএনআই-এর একটি সক্রিয় অংশ। এদের মধ্যে আবার দুই দল আছে। যাঁদের নিজস্ব টাকা (Own Money) আর যাঁদের ক্লায়েন্টের টাকা (Other's Money)।”

কাকু একটু থামলেন। তাঁর হাসিতে এক অকাট্য যুক্তি খেলে গেল। “যাঁদের নিজস্ব টাকা আছে, যেমন প্রমোটার বা ঝুনঝুনওয়ালা, তাঁদের লাভ তো শেয়ারের দাম বাড়ার মধ্যেই। আর যাঁদের নিজস্ব টাকা নেই, যেমন মিউচুয়াল ফান্ডের ম্যানেজার বা এফআইআই ফান্ড ম্যানেজার। তাঁদের আয় আসে ‘অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্ট’ (AUM) থেকে। অর্থাৎ এনএভি (NAV) যত বাড়বে, তাঁদের কমিশন আর ইনসেন্টিভ তত বেশি হবে। যদি শেয়ারের দাম কমে ১০০ কোটির ফান্ডের দাম ৭০ কোটি হয়ে যায়, তবে ফান্ডের ম্যানেজারের আয় ১ কোটি থেকে কমে ৭০ লাখে নেমে আসবে। সে কি চাইবে তার আয় কমুক?

কাকু এবার টেবিলটা মৃদু চাপড়ে বললেন, “অপূর্ব, এই শক্তিশালী হাতগুলোর লাভ কেবল শেয়ারের দাম বাড়ার মধ্যেই নিহিত। সুতরাং, তাঁরা সস্তায় কেনার জন্য দামকে নিচে নামাতে পারেন, কিন্তু নিচে ধরে রাখতে পারেন না! টিসিএস হোক বা এশিয়ান পেইন্টস - দাম যখন ২৫-৪১ শতাংশ নিচে নামে, জানবে সেটা নামানো হয়েছে সস্তায় বড় মাল তুলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তাঁদের পকেট ভরতে গেলে সেই দামকে আবার উপরে নিয়ে যেতেই হবে। এটাই গ্যারান্টি! কারণ যারা দাম নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের নিজেদের ক্ষতি হবে যদি দাম নিচে পড়ে থাকে। তাই বাজার নিচে নামতে পারে, কিন্তু নিচে রাজত্ব করতে পারে না। সে চিরকাল বীরদর্পেই ফিরে আসবে।”


অর্থনীতিবিদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের জাল - চাহিদা ও সরবরাহের’ নিয়ম

কাকু মৃদু হেসে বললেন, “অপূর্ব, আমাদের সমাজতত্ত্বে একটা বড় বিড়ম্বনা আছে। যারা অর্থনীতি নিয়ে পিএইচডি করেন, সেই অর্থনীতিবিদরা কিন্তু জগতের ‘সুপার রিচ’ বা শ্রেষ্ঠ ধনী হন না। কেন জানো? কারণ তাঁরা থিওরি বা তাত্ত্বিক জালে এমনভাবে আটকে থাকেন যে ব্যবহারিক বুদ্ধিকে বিসর্জন দেন। তাঁরা শুধু জপ করেন ‘চাহিদা ও সরবরাহের’ নিয়ম। আমি তোমাকে অর্থনীতির একটি মৌলিক পণ্যের কথা বলি। ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল। এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হয় না।”

কাকু পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন, “ভেবে দেখো, যে দেশগুলো ক্রুড উৎপাদন করে, যেমন সৌদি আরব বা রাশিয়া। সেখানকার জমি উর্বর নয় বলে জনসংখ্যাও সীমিত। অন্যদিকে ভারত, চীন বা জাপানের মতো দেশে জনসংখ্যা বিপুল, কিন্তু তাদের ক্রুড নেই, তাদের আমদানি করতে হয়। এই কেনা-বেচার পুরো অঙ্কটা একবারে নির্ভুলভাবে হিসেব করা থাকে। কয়টি গাড়ি চলবে, কত তেল লাগবে সবটাই পূর্বনির্ধারিত। যেখানে চাহিদা ও সরবরাহের বিচ্যুতি ২ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়, সেখানে ক্রুডের দাম ৩০ ডলার থেকে ১৩০ ডলার হয় কীভাবে? আবার ১৩০ থেকে ৮০ বা ১০ ডলারে নামে কীভাবে?”

কাকু আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। “এখানেই থিওরি ফেল করে অপূর্ব। কারণ দামের এই ওঠানামা অর্থনীতির ওপর নয়, বরং ‘শক্তিশালী হাতের’ কারসাজির ওপর নির্ভর করে। অর্থনীতিবিদরা তাঁদের পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে গর্ব করতে থাকেন, আর শক্তিশালী হাতগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো বাজারের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। আমি তোমাকে তিনটে ব্যবহারিক উদাহরণ দিই, যা শুনলে তুমি বুঝবে থিওরি কীভাবে বাজারের কাছে নতি স্বীকার করে।”

GST ও কমার্শিয়াল গাড়ির চাহিদা

তিনি আঙুল উঁচিয়ে প্রথম উদাহরণ দিলেন, “জিএসটি (GST) যখন চালু হলো, তাত্ত্বিকভাবে মনে হয়েছিল ট্রাক বা বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদা বাড়বে। কারণ ব্যবসা সহজ হচ্ছে। কিন্তু হলো ঠিক তার উল্টো! অশোক লেল্যান্ডের মতো কোম্পানির শেয়ার ধপাস করে পড়ে গেল। কেন? কারণ আগে যে ট্রাক ৩০ দিনে এক রাউন্ড মারত, জিএসটির কারণে এখন সে ১৫ দিনে কাজ সারছেঅর্থাৎ একটা ট্রাকই এখন দুটো ট্রাকের কাজ করছে। ফলে নতুন ট্রাকের চাহিদাই কমে গেল অর্ধেক! কোনো টিভি অ্যাঙ্কর কি এই সহজ সত্যটা সেদিন বলেছিল?”

রিয়েল এস্টেটের দাম ও হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানির ব্যবসা

দ্বিতীয় উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, “২০১৫ সালে যখন রিয়েল এস্টেটের দাম কমতে শুরু করল, সবাই ভাবল হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো এবার ডুববে। অথচ হলো তার ঠিক বিপরীত। তাদের ব্যবসা তিন গুণ বেড়ে গেল! কারণ কী? যখন দাম বাড়ত, লোকে লাভের আশায় হাতে নগদ টাকা দিয়ে বুকিং করত। কিন্তু যখনই দাম কমল, তারা লোকসান থেকে বাঁচতে জমি বিক্রি না করে বরং বাড়িটা সম্পূর্ণ করার জন্য ব্যাংকের থেকে হোম লোন নিতে শুরু করল। অর্থাৎ বাজার পড়ে যাওয়ার কারণেই ঋণের চাহিদা বাড়ল।”


মনের স্থিরতা, প্রজ্ঞা ও সম্মান

কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “অপূর্ব, এই গূঢ় সত্যগুলো বোঝার জন্য কোনো বিশালাকার ডিগ্রির দরকার নেই। দরকার শুধু স্থির মনের। কিন্তু সেই স্থির মন আসবে কোত্থেকে? যদি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে তুমি চা খেতে খেতে মোবাইলে ‘রিলস’ আর অর্থহীন বিনোদনের নেশায় ডুবে থাকো, তবে তোমার মস্তিষ্ক এই গভীর সত্যগুলো ভাবার সময় পাবে না। নিজের সাথে কথা বলো, অন্যদের সাথে নয়। নিজের জন্য সময় বের করা মানে বিয়ারের আড্ডায় বসা নয়, বরং জপ করা বা একা নিভৃতে চিন্তা করা।”

কাকু আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো এখন জ্বলজ্বল করছে। “৯৯ শতাংশ মানুষ ওই বিনোদন আর ভিড়ের নেশায় মত্ত থাকে বলেই তারা দরিদ্র থেকে যায়। আর মাত্র ১ শতাংশ মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে লিখে নেয়। মনে রেখো, অর্থনীতি অধিকাংশ সময় শেয়ার বাজারে বিপরীতমুখী আচরণ করে। যারা ভিড়কে অনুসরণ করে না, জগত কেবল তাদেরই মুকুটে সাফল্যের পালক গুঁজে দেয়।”

লাইব্রেরি ঘরের নীল আলোয় কাকুর অবয়বটা এক মায়াবী রূপ নিল। আমি বুঝতে পারলাম, শেয়ার বাজার কোনো সংখ্যাতত্ত্বের যুদ্ধ নয়, এটি নিজের চরিত্রের সাথে নিজের এক নিরন্তর লড়াই।

কাকু ডায়েরির শেষ পাতায় একটা ছোট রেখা টানলেন। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অপূর্ব, ৯৯ শতাংশ মানুষ হারবে। কারণ তারা অজ্ঞ। তারা বোঝে না যে শেয়ার বাজার কোনো জটিল পাটিগণিত বা বীজগণিত নয়; এটা স্রেফ মানুষের মনের এক বিচিত্র খেলা। জানো তো, এই বাজারে অতি ধনী হওয়ার জন্য কেবল তৃতীয় শ্রেণীর জ্ঞানই যথেষ্ট। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ আর সামান্য শতাংশের হিসেব। ব্যস! বাকি সবটুকু হলো নিজের ভেতরের কুঠারকে ধার দেওয়া।”

কাকু একটু থামলেন। তাঁর স্বরে এক পরম আশীবাদ ঝরে পড়ল। “আমরা ভাবি ভাগ্য আকাশ থেকে পড়ে। না অপূর্ব, ভাগ্য তৈরি করতে হয়। টাকাকে সম্মান করতে শেখো। যে বসের অধীনে কাজ করছ, তাঁকে শ্রদ্ধা না করলে তুমি কোনোদিন নিজে বস হতে পারবে না। সিইও (CEO) হওয়ার প্রথম গুণ হলো নিজের ঊর্ধতনকে সম্মান করা। নিজেকে ছোট ভাবতে শেখো, বড়দের কথা মানতে শেখো। তবেই বড় হওয়ার পথ খুঁজে পাবে। আমরা কী করি? আমরা অন্যের চর্চায় ব্যস্ত থাকি। নিজের শরীর আর মনের জন্য দু-ঘণ্টা ব্যয় করার সময় আমাদের নেই, অথচ ফোনের মায়াজালে পাঁচ ঘণ্টা অবলীলায় নষ্ট করে দিই। নিজের কুঠারে ধার না দিলে কি বড় গাছ কাটা যায়? যায় না!”


পুঁজিবাদ ও শরীর, মন আর ধনের ভারসাম্য

কাকু জানলার বাইরে দিগন্তের দিকে হাত ইশারায় দেখালেন। “মনে রেখো, শরীর, মন আর ধন এই তিনটে জিনিসের ভারসাম্যই হলো আসল সাফল্য। প্রতিদিন অন্তত আধ ঘণ্টা জপ করো। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের সেই অমোঘ কম্পন তোমার ভেতরে এমন এক শক্তি তৈরি করবে যা তোমাকে শারীরিক, মানসিক আর আর্থিক কোনোভাবেই ভেঙে পড়তে দেবে না। নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত নেশা নিয়ে এসো। সেই নেশা মদের নয়, সেই নেশা হবে ‘শক্তি’র নেশা। সেই শক্তি যা দিয়ে তুমি আম্বানি বা আদানির মতো লক্ষ মানুষের অন্নসংস্থান করতে পারো। মনে রেখো, কেবল পুঁজিবাদী আর শক্তিশালী ধনীরাই কোনো দেশকে রক্ষা করতে পারে। দরিদ্ররা নয়।”

তিনি ডায়েরিটা বন্ধ করলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আজ আমরা শুধু অপারেটরদের চাল কিংবা বাজারের পতন নিয়ে কথা বলিনি, আজ আমরা মানুষের চরিত্র নিয়ে কথা বলেছি। আগামী কাল থেকে শুরু হবে আমাদের আসল কৌশল। কীভাবে ব্যবসা খুঁজে বের করতে হয়, কীভাবে সঠিক কোম্পানির জহুরি হতে হয়। মনে রেখো অপূর্ব, যখন তুমি রোলস রয়েসে বসে থাকবে, কেউ তোমার স্কুলের ডিগ্রির খবর নেবে না। তোমার শক্তিই হবে তোমার পরিচয়।”

কাকু আমার কাঁধে হাত রাখলেন। “যাও, আজ বিশ্রাম নাও। আগামীকাল আমরা ব্যবসার গভীরে ডুব দেব। মনে রেখো, যুদ্ধ জয়ের আগে নিজের শত্রুকে চিনতে হয়। আমরা সেই ৯৯ শতাংশের মনস্তত্ত্ব চিনে ফেলেছি, এবার ১ শতাংশের সিংহাসন দখলের পালা।”


এই লেখাটি যদি আপনার ভাবনাকে নাড়া দিয়ে থাকে, তাহলে পোস্টটি শেয়ার করুন এবং ভবিষ্যতের পর্বগুলো মিস না করতে অর্থসূত্র (Arthosutro) ব্লগটি বুকমার্ক করে রাখুন।

পরবর্তী পর্বে আমরা ঢুকব বিনিয়োগের আসল কৌশলের গভীরে।



ভাস্কর বসু | মাইকেলনগর, কোলকাতা


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন