ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬

ডলার কাকুর ডায়েরি পর্ব ২ | কেন ৯৯% মানুষ স্টক মার্কেটে হারায়? শৃঙ্খলা, মনস্তত্ত্ব ও সম্পদ তৈরির গোপন সূত্র

জমিদার বাড়ির বৈঠকখানায় সাদা পাঞ্জাবি পরা ডলার কাকু এক তরুণ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চায়ের টেবিলে শেয়ার বাজার নিয়ে আলোচনা করছেন।
ডলার কাকুর সঙ্গে অপূর্বের সন্ধ্যার আড্ডা। শৃঙ্খলা, সময় আর বাজারের পাঠ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ডলার কাকুর ডায়েরির শুরুর গল্পটি জানতে পড়ুন: ডলার কাকুর ইনভেস্টমেন্ট লেসন (পর্ব-১)


বাঁধের ক্লান্তি থেকে জমিদার বাড়ির আড্ডা

সকাল থেকেই নীলগিরি জলাধারের বিশাল বাঁধটার ওপর তপ্ত রোদে ছোটাছুটি করতে হয়েছে। ইরিগেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এই কদিন কাজের প্রচণ্ড চাপ। স্লুইচ গেটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ আর আসন্ন বর্ষার আগে জলধারণ ক্ষমতার চুলচেরা বিশ্লেষণ সব মিলিয়ে মাথার ভেতরটা তখন শুধুই টেকনিক্যাল ডেটা আর গাণিতিক হিসেব নিকাশের ক্লান্তিকর এক গোলকধাঁধায় ঠাসা।

বিকেল যখন ম্লান হয়ে এল, অফিসের জিপটা নিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ মনটা হু হু করে উঠল। ড্রাইভারকে বললাম গাড়িটা বাঁদিকের ওই পুরোনো সিংহদুয়ারের দিকে ঘোরাও। পাহাড়ের ঢালে সেই প্রাচীন জমিদার বাড়িNটি যেন আমায় কোনো এক অদৃশ্য মায়াবী টানে ডাকছিল।

জমিদার বাড়ির ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো অন্য এক জগতে পা রাখলাম। চারদিকে যত্ন করে সাজানো এক বিশাল বাগান। বিকেলের পড়ন্ত সোনালি রোদ সেই নাম না জানা পাহাড়ি ফুলের ওপর পড়ে এক বিচিত্র বর্ণচ্ছটা তৈরি করেছে। কোথাও রক্তাভ অর্কিড, কোথাও স্নিগ্ধ নীল লতাগুল্ম। সেই বুনো সুবাসে সারা দিনের তপ্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষেই ধুয়ে মুছে গেল।

বাগানের শেষ প্রান্তের লনে দেখা হয়ে গেল তাঁর সঙ্গে। সাদা সিল্কের পাঞ্জাবিতে ভবানীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ওরফে ডলার কাকু তখন পরম মমতায় একটি বিরল প্রজাতির গোলাপের পরিচর্যা করছেন। আমাকে দেখেই তাঁর মুখে সেই ভুবনভোলানো অমায়িক হাসি।

কী অপূর্ব, বাঁধের কাজ শেষ হলো। চলো, রোদ পড়ে আসছে, ভেতরে গিয়ে বসা যাক।

আমরা এসে বসলাম জমিদার বাড়ির সেই বিশাল বৈঠকখানা ঘরে। কড়িকাঠের উঁচু সিলিং, দেওয়ালে পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র আর পুরোনো চামড়ায় বাঁধানো বইয়ের মলাট থেকে চুইয়ে আসা এক প্রাচীন আভিজাত্যের গন্ধ ঘরটাকে এক মায়াবী গাম্ভীর্যে ভরিয়ে রেখেছে। পরিচারক রুপোর নকশা করা ট্রের ওপর দু কাপ কড়া লিকার চা দিয়ে গেল। বাইরে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য তখন সিঁদুরে আভা ছড়িয়ে বিদায় নিচ্ছে।


শৃঙ্খলা ছাড়া বাজারে সাফল্য অসম্ভব

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে আমি একটু ইতস্তত করে প্রশ্নটা করেই ফেললাম। বললাম কাকু, বাঁধের ওই অতল জলরাশি আর কপাটের প্রবল চাপ যখন হিসেব করতে বসি, তখন সবটাই জলের মতো পরিষ্কার ঠেকে। কিন্তু আপনার এই বাজারের অঙ্ক শিক্ষিত মানুষের কাছেও কেন এমন গোলমেলে লাগে। কেন এখানে এসে বড় বড় বুদ্ধিমান লোকেরাও পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে।

ডলার কাকু আরামকেদারায় দেহটা একটু এলিয়ে দিলেন। তাঁর শান্ত দৃষ্টি জানলার বাইরে ধূসর দিগন্তের কোনো এক গূঢ় সত্যের সন্ধানে নিমগ্ন হলো। ঘরের সেই সুগম্ভীর নিস্তব্ধতা ভেঙে তিনি অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন।

​"অপূর্ব, তুমি বাঁধের লোহার কপাট অবলীলায় শাসন করতে পারো, সেখানে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু পৃথিবীতে খুব কম মানুষই নিজের জীবনের লাগামকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। একটি বাস্তব সত্য হলো, শেয়ারবাজার কোনো জাদুদণ্ড নয়; ওটা মানুষের অভ্যাসের এক বিশাল স্বচ্ছ আয়না মাত্র। তোমার ভেতরে যা আছে, বাজার ঠিক তার প্রতিফলনই তোমার সামনে তুলে ধরবে। যদি কোনো মানুষের ব্যক্তিগত ও প্রাত্যহিক জীবনে শৃঙ্খলা না থাকে, যদি অসংযম আর আলস্য তার নিত্যকার সাথী হয়, তবে এই পুঁজিবাজারে সফল হওয়ার আশা করা আর মরুভূমিতে তুষারপাতের কল্পনা করা একই কথা। বিশ্বাস করো অপূর্ব, যার ব্যক্তিগত জীবনে খারাপ অভ্যাসের অন্ধকার আর শৃঙ্খলার অভাব আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, স্টক মার্কেটের ঝলমলে আলোয় সে শুধু দিকভ্রান্তই হবে।"


ব্যক্তিগত জীবনের আয়নায় বাজার

কাকু একটু থামলেন। তাঁর চোখেমুখে এক মায়াবী অথচ ইস্পাতকঠিন কাঠিন্য ফুটে উঠল। চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে তিনি আরও গভীরে প্রবেশ করলেন:

​"অধিকাংশ মানুষ মরীচিকার মতো এক মিথ্যা কল্পনায় নিজের ভাবনার জাল বুনে যায়। তারা ভাবে শেয়ার বাজার বুঝি এক আলাদা জগৎ। সেখানে প্রবেশ করলেই রাতারাতি ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে। কিন্তু জীবনের ভিত যার নড়বড়ে, বাজারের উচ্চতম শিখরে পা রাখার সাধ্য তার নেই। যদি স্টক মার্কেটে প্রকৃত সাফল্য পেতে হয়, তবে তার আগে ব্যক্তি হিসেবে তোমাকে আরও উন্নত, আরও নিখুঁত হতে হবে। যে মানুষটির নিজের গৃহকোণে শৃঙ্খলা নেই, যার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিয়মের বালাই নেই, যে অফিসের গুরুদায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান নয়; সে হঠাৎ এই বাজারের জটিল গোলকধাঁধায় এসে একনিষ্ঠ সাধক হয়ে উঠবে, এমন অলৌকিক ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে কোনোদিন ঘটেনি। স্টক মার্কেটের পুরো খেলাটাই কিন্তু চূড়ান্ত শৃঙ্খলার।"


ছোট অভ্যাস থেকে বড় জয়

বিকেলের শেষ আলোটুকু কাকুর চোখের মণিতে এক তীক্ষ্ণ দীপ্তি ছড়িয়ে দিল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন:

​"যেখানে চরম ধৈর্য আর কঠোর নিয়মানুবর্তিতার প্রয়োজন, সেই হিমালয়সম উচ্চতায় ওঠার আগে তোমাকে জীবনের অতি সাধারণ ধাপগুলো পার হতে হবে। নিচের স্তরগুলোতে যদি তুমি সুশৃঙ্খল হতে না পারো, তবে ওপরের কঠিন পরীক্ষায় তুমি মুখ থুবড়ে পড়বে। এই বাজারের প্রথম পাঠ কোনো গাণিতিক সূত্র বা জটিল এলগরিদম নয়; ওটা হলো নিজের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। আর এর শুরুটা হতে হবে একদম ছোট ছোট কাজ থেকে। যা করণীয়, তা ঠিক সময়মতো সম্পন্ন করার অভ্যাস রপ্ত করতে হবে। সেখানে কোনো আলস্য, কোনো দীর্ঘসূত্রতা বা অজুহাতের তিলমাত্র স্থান নেই।"

কাকু এবার আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন:

​"আমার কথা বুঝতে পারছো অপূর্ব? সুশৃঙ্খল হওয়া স্টক মার্কেটে সফল হওয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত। যদি এই বাজারে বিজয়ী হতে চাও, তবে আগে নিজের জীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনো। নিজের কাজকে অগ্রাধিকার দিতে শেখো। কোন কাজটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা যদি ঠিক করতে না পারো, তাহলে পরে সবকিছু গোলমাল হয়ে যাবে। জীবনের মতো বাজারের ময়দানেও তোমাকে স্থির করতে হবে। তুমি কি প্রতিনিয়ত স্টক প্রাইসের পেছনে ছুটবে, নাকি শান্ত মনে নিজের পোর্টফোলিও পর্যবেক্ষণ করবে? তুমি কি শুধু চার্ট প্যাটার্নের রেখাচিত্র দেখবে, নাকি নিজের ধৈর্য্য ও নিয়মের শক্তিতে বাজারকে জয় করবে? এই অগ্রাধিকার ঠিক করতে না পারলে বাজারের ঐ মরীচিকার পিছনে ছুটতে ছুটতে তুমি নিশ্চিত পথ হারাবে।"


৯৯% এর বড় ভুল: লাল-সবুজের নেশা

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছিলাম। ডলার কাকু এক মুহূর্তের জন্য থামলেন, জানলার বাইরের আবছায়া অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর আবার শুরু করলেন:

​"অধিকাংশ মানুষ এই বাজারে এসে একটা মস্ত ভুল করে। তারা সারাদিন চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে তাদের পোর্টফোলিওটার দিকে। আজ কতটা লাল হলো আর কতটা সবুজ! এই রঙের খেলা দেখে সময় নষ্ট করা পৃথিবীর সবথেকে বড় বাতুলতা। পোর্টফোলিওতে ওই লাল-সবুজ সংখ্যাগুলো দেখা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়।

​গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই কারণগুলো খুঁজে বের করা, যার ওপর ভিত্তি করে তুমি শেয়ারটি কিনেছিলে। যে চার্ট প্যাটার্ন দেখে তুমি এগোলে, সেটা কি তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে? কোম্পানির ত্রৈমাসিক ফলাফল কি তোমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারল? দুর্ভাগ্য হলো, আমরা চার্ট প্যাটার্ন নিয়ে গবেষণা করি না; আমরা 'স্ক্রিনার ডট ইন' (Screener.in)-এ গিয়ে কোম্পানির নাড়িনক্ষত্র খুঁজি না। তার বদলে আমরা বারবার জিরোধার পোর্টফোলিও খুলে দেখি আজ কত টাকা বাড়ল আর কত কমল। লোকসানে বিক্রি করবো না। তবুও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। এটা একটা মস্ত বড় ভুল পদ্ধতি। যা করা উচিত ছিল, সেটা আমরা করছি না; আর যা বর্জনীয়, সেটাই আমরা সারাদিন করে যাচ্ছি।"


পোর্টফোলিও চেক করার সঠিক উপায়

কাকু এবার টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটা একটু টেনে নিলেন। আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন:

​"বুঝতে পারছো তো? এই গোলকধাঁধায় ঢোকার আগে আমাদের নিজেদের কাছেই কোনো 'নোট' থাকে না যে ঠিক কী করতে হবে। সাধারণত কী হয় জানো? কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, 'বাজারে এখন খুব অস্থিরতা, তুমি কী করবে?' - তখন অধিকাংশ মানুষই খুব বীরত্বের সাথে উত্তর দেয়, 'তাতে কী হয়েছে? আমার টার্গেটে পৌঁছলে তবেই বিক্রি করব, নইলে করব না।' যারা প্রথমবার ট্রেড নিচ্ছে, তাদের ৯৯ শতাংশই বলে, দামের পতন হলে তারা শেয়ার ধরে রাখবে, লাভ না আসা পর্যন্ত ছাড়বে না।


কেনার কারণ ভুলে দামের পেছনে ছোটা

​কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। যখন ট্রেড নেওয়ার পরের দিনই শেয়ারের দাম ৫ বা ৬ শতাংশ পড়ে যায়, তখন সেই সাহস কর্পূরের মতো উড়ে যায়। তখন মনে হয়, হায় ঈশ্বর! আমরা কি তবে ভুল পথে হাঁটছি? অথচ শোনো অপূর্ব, তোমার কেনার পর শেয়ারের দাম বাড়ছে না কমছে - সেই তুচ্ছ ঘটনা কখনোই তোমার সিদ্ধান্তের নির্ভুলতাকে প্রমাণ করে না। দাম উপরে যাওয়া বা নিচে যাওয়ার ওপর তোমার সঠিক বা ভুলের তকমা নির্ভর করে না।"

কাকু একটু ঝুঁকে এলেন আমার দিকে, তাঁর কণ্ঠস্বর আরও গভীর হলো:

​"আমাদের সঠিক বা ভুলের বৈধতা নির্ভর করে অন্য কিছুর ওপর। আমরা ব্যবসাটা কতটা বুঝেছিলাম? কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বা চার্ট প্যাটার্নগুলো কি আমরা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছিলাম? যদি এসব কিছু না বুঝে তুমি হুজুগে পড়ে ট্রেড নাও, তবে তুমি লাভে থাকলেও আসলে তুমি 'ভুল'। আর যদি সমস্ত নিয়ম মেনে, সব অংক কষে তুমি পা বাড়াও - তারপরেও যদি স্টক প্রাইস নিচে নেমে আসে, তবুও তুমি 'সঠিক'। এমনকি যদি তোমার সেই ট্রেডটি আপাতত মাইনাসেও থাকে, তবুও তুমি তোমার সিদ্ধান্তে নির্ভুল।

​সুতরাং, তাৎক্ষণিক লাভ বা ক্ষতি দিয়ে নিজেকে বিচার কোরো না। বিচার করো এই ভেবে যে - যে পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করার কথা ছিল, তুমি সেগুলো মেনে চলেছ কি না। যদি নিয়ম মেনে কাজ করো, তবে তুমি সফল। ফলাফল কী হলো, তা তাৎক্ষণিকভাবে না দেখে সময়ের হাতে ছেড়ে দাও। কারণ মনে রেখো অপূর্ব, বাজারের এই দীর্ঘ পথে পদ্ধতির নির্ভুলতাই শেষ কথা বলে।"


দাম ও সময়ের অনিশ্চয়তার খেলা

ডলার কাকু এবার জানলার দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু হাসলেন। বিকেলের ম্লান আলোয় তাঁর শান্ত মুখচ্ছবি যেন এক গভীর অভিজ্ঞতার চিত্রপট। তিনি বলতে শুরু করলেন:

​"অপূর্ব, ব্যবসাটাকে ব্যবসার মতো বুঝতে শিখলে এই বাজারের অস্থিরতা তোমাকে আর বিচলিত করবে না। মনে করো এক সাধারণ দোকানদারের কথা। সে যখন নতুন কোনো মাল কিনে দোকানে আনে, সে কি নিশ্চিতভাবে জানে যে পরের দিনই তা লাভে বিক্রি হয়ে যাবে? মোটেই না। তার দোকানে হয়তো হাজারটা জিনিস আছে। কোনোটা হয়তো আলমারিতে তোলার এক ঘণ্টার মধ্যেই খরিদ্দার এসে নিয়ে যায়, আবার কোনোটা হয়তো ধুলো মেখে মাসের পর মাস পড়ে থাকে। দোকানদার জানে না কার ভাগ্য কখন খুলবে। শেয়ার বাজারটাও ঠিক ওই দোকানদার আর তার মালের মতোই আচরণ করে। এখানে অনিশ্চয়তা হলো ধ্রুব সত্য।"


দোকানদারের মতো ধৈর্য ধরুন

​কাকু ডায়েরির একটি সাদা পাতায় কলম দিয়ে দুটো শব্দ লিখলেন - 'দাম' আর 'সময়'। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন:

​"এই বাজারে পা রাখলে তোমাকে দুটো বড় অনিশ্চয়তাকে লিখে রাখতে হবে বুকের ভেতর। এক হলো দামের ওঠানামা, আর দুই হলো 'হোল্ডিং পিরিয়ড' বা কতক্ষণ তুমি সেটা ধরে রাখবে। আমরা জানি না কেনার ঠিক পরেই দামটা লাফিয়ে উঠবে না কি আরও তলিয়ে যাবে। অনেক সময় হয়, আমরা টার্গেটে পৌঁছানোর পর শেয়ার বিক্রি করে দিই, আর পরক্ষণেই দেখি দামটা আরও বেড়ে গেল। আমাদের তখন মনে হয় আমরা বুঝি মস্ত ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু আসলে তা নয়, এটা বাজারের স্বভাব। তুমি তোমার নিয়ম মেনে টার্গেটে বিক্রি করেছ, সেটাই বড় কথা।"


পোর্টফোলিওর সামগ্রিক জয়ই লক্ষ্য

​তিনি চশমাটা আর একবার মুছে নিয়ে বলতে লাগলেন:

​"একইভাবে, তুমি হয়তো হিসেব কষেছ যে একটা বিশেষ শেয়ার এক বছরে তোমাকে ৩০ বা ৪০ শতাংশ লাভ দেবে। কিন্তু দেখা গেল এক বছর কেটে গেল অথচ দামের কোনো নড়াচড়া নেই। তখন কি তুমি ভুল? না, তুমি ভুল নও। কারণ সময়ের হিসেবে কোনো মানুষই ১০০ শতাংশ নির্ভুল হতে পারে না। কখনো যে টার্গেট এক বছরে পাওয়ার কথা, তা তিন মাসেই চলে আসে; আবার কখনো এক বছরের লক্ষ্য পূরণ হতে দু-তিন বছরও লেগে যায়। এমনকি সেই দীর্ঘ অপেক্ষায় শেয়ারটির দাম মাঝে মাঝে ৫০ শতাংশ নীচে পড়ে থাকতে পারে।"

​ডলার কাকুর কণ্ঠস্বর এবার আরও গম্ভীর হলো, যেন শেষ কথাটি তিনি আমার মনের গহীনে গেঁথে দিতে চাইলেন:

​"মনে রেখো, আমরা যখন এই বাজার থেকে অর্থ উপার্জনের কথা বলি, তখন আমরা কোনো একটি বিশেষ শেয়ারের ওপর ভরসা করি না। আমরা কথা বলি আমাদের 'সামগ্রিক পোর্টফোলিও' নিয়ে। তোমার ঝুড়িতে যদি ২৫টি কোম্পানির শেয়ার থাকে, তবে এটা ভাবা নেহাতই বোকামি যে ওই ২৫টি কোম্পানিই প্রতি বছর তোমাকে একই তালে লাভ দিয়ে যাবে। এটা মোটেও জরুরি নয়। কোনোটা হয়তো দৌড়াবে, কোনোটা হয়তো জিরিয়ে নেবে। আমাদের লক্ষ্য হলো সামগ্রিকভাবে পুরো পোর্টফোলিওকে লাভজনক রাখা, প্রতিটি স্টককে নয়। সবকটি শেয়ার একই সাথে সোনা ফলিয়ে দেবে, এমন অলৌকিক আশা ছেড়ে যখন তুমি সামগ্রিক লাভের দিকে নজর দেবে, তখনই তুমি প্রকৃত বিনিয়োগকারী হয়ে উঠবে।"

কাকু এবার সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে এক অমোঘ নিশ্চয়তা। আমি অনুভব করলাম, সামনের এই কথাগুলো শুধু অংকের হিসেব নয়, এগুলো এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নির্যাস।

​কাকু বলতে শুরু করলেন, "অপূর্ব, তোমাকে কী করতে হবে জানো? যা আমি শেখাব, হুবহু অনুসরণ করতে হবে। যদি এই শৃঙ্খলার শিকল একবার আলগা হয়, তবে পরিণাম ভালো হবে না। কিন্তু যদি তুমি এই পদ্ধতির প্রতি সৎ থাকো, তবে দেখবে প্রতি তিন বছরেই তোমার পুঁজি দ্বিগুণ হচ্ছে। হয়তো তার চেয়েও বেশি। দশ বছরের মাথায় সেই মূলধন দশ থেকে পনেরো গুণের মহীরুহে পরিণত হবে। আর বিশ বছরের সেই দীর্ঘ যাত্রায়? তোমার আজকের ছোট বীজটি একশো থেকে দেড়শো গুণের এক বিশাল বনস্পতি হয়ে উঠবে।"

​জানলার বাইরে বিকেলের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছিল। কাকু এক মুহূর্ত বিরতি নিলেন, তারপর আবার বললেন, "মনে রেখো অপূর্ব, এই পথটি দীর্ঘ। এখানে প্রতিটি বছর একরকম যাবে না, প্রতিটি মাস তোমাকে একই স্বস্তি দেবে না। সব স্টক একভাবে আচরণ করবে না, এমনকি সব কৌশল সব সময় একইভাবে কার্যকর হবে না। এখানে সবকিছুই নিয়ত পরিবর্তনশীল। কিন্তু ঠিক এই কারণেই - সবকিছু এখানে অনিশ্চিত বলেই, শেয়ার বাজারের ক্ষমতা আছে তোমাকে ফিক্সড ডিপোজিটের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ, এমনকি দশ গুণ বেশি সম্পদ এনে দেওয়ার।"

​আমি অবাক হয়ে তাকালাম। কাকু মৃদু হেসে বললেন, "অন্ধকারে পথ হারিয়ো না। যদি বাজারের সবকিছু ফিক্সড ডিপোজিটের মতো নিশ্চিত আর ধরাবাঁধা হতো, তবে রিটার্নটাও আসত ওই সামান্য কয়েক শতাংশ। তার বেশি এক আনাও তুমি পেতে না। বাজারে কেন ফিক্সড ডিপোজিটের চেয়ে এত বেশি টাকা কামানোর সুযোগ আছে জানো? কারণ এখানে অনেক কিছু নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। সাধারণ মানুষ এই অনিশ্চয়তাকে ভয় পায়, কিন্তু তুমি একে আপন করতে শেখো। এই অনিশ্চয়তা আমাদের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরোপুরি আমাদের পক্ষে। যদি বাজার থেকে এই অনিশ্চয়তাটুকু মুছে যেত, তবে প্রতি আড়াই বা তিন বছরে টাকা দ্বিগুণ করার এই অদ্ভুত জাদুকরী সম্ভাবনাটুকুও বিলীন হয়ে যেত।"


স্টক মার্কেটের আসল সত্য: ৯৯% → ১%

​কাকু এবার টেবিলের ওপর রাখা চশমাটা পরে নিলেন। ঘরের স্তব্ধতা যেন আরও গভীর হলো। তিনি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা অদ্ভুত গম্ভীর স্বরে বললেন:

​"সব তো হলো অপূর্ব, এবার তবে সবচেয়ে প্রধান কথাটা বলি। বল তো শুনি, আসলে এই ‘স্টক মার্কেট’ বস্তুটা ঠিক কী?"

আমি স্তব্ধ হয়ে কাকুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। জানলার ওপার থেকে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ঘরের স্তব্ধতা মিলেমিশে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য তৈরি করেছে। কাকু তাঁর চশমাটা নাকের ডগায় একটু ঠিক করে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন।

​"অপূর্ব, এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আসলে কী জানো? অনেক মানুষ বুক ফুলিয়ে বলে—'ভাই, আমি গত দশ/পনেরো বছর ধরে বাজারে আছি।' কিন্তু যখনই আমি তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি, 'দশ বা পনেরো বছরে নিজের ভাঁড়ারে ঠিক কতটা সম্পদ জমা করলেন?' তখনই শুরু হয় অজুহাতের পাহাড়। কেউ বলে বাজারের দশা খারাপ ছিল, কেউ বলে ভাগ্যের ফের। দশটা বছর অনেকটা সময় অপূর্ব! এই দীর্ঘ সময়েও যদি পকেটে কড়ি না আসে, তবে বুঝতে হবে গণ্ডগোলটা গোড়াতেই।"


তাত্ত্বিক জ্ঞান বনাম ব্যবহারিক প্রজ্ঞা

​কাকু একটু থামলেন, যেন আমার মনের ভেতরে সংশয়ের মেঘগুলো জমতে দিলেন। তারপর আবার বললেন, "সমস্যাটা হলো, এই যে মানুষগুলো বলছে তারা দশ বছর ধরে বাজারকে ‘জানে’, আসলে সেই জানাটা স্রেফ মরীচিকা। তারা বাজারের তাত্ত্বিক প্রশ্নের পুঁথিগত উত্তর দিতে ওস্তাদ। তারা মুখস্থ বলতে পারবে বোনাস কী, রাইট ইস্যু কী, স্টপ লস বা ইক্যুইটি শেয়ার কাকে বলে। লার্জ ক্যাপ, মিড ক্যাপ কিংবা পিই রেশিও নিয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক করতে পারে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই কিতাবি বিদ্যা দিয়ে পকেটে টাকা আসে না। তারা গাড়ির গিয়ার, স্টিয়ারিং, পেট্রোল, ডিজেল আর এবিএস (ABS) চিনতে শিখল ঠিকই, কিন্তু দিনের শেষে গাড়ি চালানোই শিখল না।"

​তিনি একটা চমৎকার উদাহরণ দিলেন, যা শুনে আমার হাসি পেলেও বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করে উঠল।

​"মনে করো তুমি একটা গাড়ি চালাচ্ছ। এখন স্টিয়ারিংকে যদি তুমি স্টিয়ারিং না বলে সাইকেলের মতো 'হ্যান্ডেল' বলো, তাতে কি তোমার গাড়ি চালানো থেমে যাবে? মোটেই না। কেউ হয়তো ভুল ধরে বলবে, 'ভাই, ওটাকে হ্যান্ডেল নয়, স্টিয়ারিং বলে।' কে পরোয়া করে নাম নিয়ে? আমাদের প্রয়োজন গাড়িটি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছনো, ওটার কলকব্জার গালভরা নাম মুখস্থ করা নয়। নাম না জেনেও যদি তুমি সাফল্যের সাথে গাড়িটা ড্রাইভ করতে পারো, তবেই তুমি সফল। কিন্তু ৯০ শতাংশ মানুষ শুধু ওই নাম নিয়েই পড়ে থাকে।"


আইনস্টাইনও হেরেছেন, কেন?

​কাকুর কণ্ঠস্বর এবার আরও গম্ভীর হলো, যেন তিনি এক ধ্রুব সত্য উচ্চারণ করতে চলেছেন।

​"অপূর্ব, একটা করুণ পরিসংখ্যান শোনো। বাজারে ৯৭ শতাংশ লোক তাদের কষ্টের টাকা হারায়। মাত্র ১ শতাংশ মানুষ শেষমেশ টাকা কামাতে পারে, আর ২ শতাংশ মানুষ কেবল টিকে থাকে। অথচ ওই ৯৭ শতাংশ লোককেও যদি জিজ্ঞেস করো, 'আপনি কি বাজার বোঝেন?' তারা সবাই জোর গলায় বলবে, 'হ্যাঁ বুঝি!' আসলে তারা শুধু তাত্ত্বিক প্রশ্নের তাত্ত্বিক উত্তর জানে। একটা ছোট বাচ্চা যেমন চাকা দেখে বলে, 'ওই দেখো ওটা চলে', এরাও ঠিক তেমনি বোঝে যে বাজার চলে, কেন চলে আর কীভাবে চালানো উচিত - তা জানে না।"

​আমি কাকুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। তিনি এবার আমার সেই বহু প্রতীক্ষিত প্রশ্নের উত্তর দিলেন - স্টক মার্কেট কী?

​"যদি তুমি বইয়ে পড়ো বা গুগল করো, তবে দেখবে লেখা আছে—স্টক মার্কেট হলো এক আইনি প্রক্রিয়া বা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা হয়। এটা হলো তাত্ত্বিক উত্তর। কিন্তু এই উত্তর দিয়ে কি তোমার পেটের খিদে মিটবে? মিটবে না। এর একটা আসল ব্যবহারিক উত্তর আছে, যা ডায়েরির পাতায় নয়, বরং অভিজ্ঞতার পাতায় লেখা থাকে।"

​কাকু আমার চোখের মণি দুটোর দিকে সরাসরি তাকিয়ে অমোঘ সত্যটা উচ্চারণ করলেন:

"স্টক মার্কেট হলো এমন এক আইনি প্রক্রিয়া বা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ৯৯ শতাংশ মানুষের পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে ১ শতাংশ মানুষের পকেটে গিয়ে জমা হয়। এটাই বাজারের আসল এবং একমাত্র সত্যি পরিচয়।"

​ঘরের স্তব্ধতা যেন কাকুর এই শেষ কথাটাকে আরও রহস্যময় করে তুলল। আমি বুঝলাম, আমি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো শুধু 'জানতে' আসিনি, আমি এসেছি ওই ১ শতাংশ মানুষের দলে ঢোকার 'কৌশল' শিখতে।

কাকু তাঁর হাতের কলমটা টেবিলের ওপর রাখলেন। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী হাসলেন, যেন আমার মনের ভেতরে চলতে থাকা বিস্ময়টাকে তিনি আগেভাগেই পড়ে ফেলেছেন।

​কাকু বলতে শুরু করলেন, "অপূর্ব, এই ৯৯ শতাংশ আর ১ শতাংশের অংকটা যখন তুমি হৃদয়ে গেঁথে নিতে পারবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তোমার মনের বদ্ধ জানলাগুলো খুলতে শুরু করবে। তখন তুমি নিজেকেই প্রশ্ন করবে, কেন এই ৯৯ শতাংশ মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে? তাদের কি শিক্ষার অভাব? তাদের কি মগজে বুদ্ধি কম? নাকি তাদের কাছে দামি ল্যাপটপ বা সময় নেই? না! তাদের কাছে সবই আছে। এই হারতে থাকা ৯৯ শতাংশ মানুষের ভিড়ে তুমি দেখবে বড় বড় পিএইচডি ডিগ্রিধারী, স্বনামধন্য ডাক্তার, ঝানু চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, এডভোকেট কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ ম্যানেজারদের। শিক্ষার আলোয় তারা উজ্জ্বল, অথচ বাজারের অন্ধকারে তারা দিশেহারা।"

​আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তবে কি ওই ১ শতাংশ মানুষ যারা কামাচ্ছে, তারা আরও বেশি শিক্ষিত?"

​কাকু হা হা করে হেসে উঠলেন। "বিপরীতটাই সত্যি, অপূর্ব! যারা বাস্তবে এই বাজারে রাজত্ব করছে, ওই যে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ, তাদের অর্ধেকের বেশি হয়তো কোনোদিন গ্র্যাজুয়েশনের মুখই দেখেনি। তারা কোনো নামী কোম্পানিতে এসি ঘরে বসে ফাইল ওড়ায়নি, তারা স্কুল-কলেজের ফার্স্ট বয় ছিল না, এমনকি তাদের রেজাল্টে ফার্স্ট ডিভিশনের তকমাও ছিল না। তবুও তারা সফল। কারণ কী জানো? কারণ এই মানুষগুলো নিজেদের খুব বেশি বুদ্ধিমান বলে মনে করে না।"


শিক্ষার অহংকার: বুদ্ধিমানদের পতন

​কাকু একটু থামলেন। কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে তিনি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন, "মন দিয়ে শোনো অপূর্ব। আমি তোমার মনের ভিতটা আগে শক্ত করে গড়তে চাই। আমার উদ্দেশ্য হলো তোমার ভেতরে থাকা সমস্ত ধোঁয়াশা পরিষ্কার করা। মনে রেখো, তুমি বাজারে টাকা হারাবে কৌশল জানো না বলে নয়; তুমি হারবে কারণ তুমি নিজেকে বাকি সবার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান বলে মনে করো। আমাদের পদের অহংকার, আমি কোনো কোম্পানির ম্যানেজার, ভিপি কিংবা ডিরেক্টর - এই অহংকারই আমাদের ডুবিয়ে দেয়।"

​তিনি এক অমোঘ সত্যের অবতারণা করলেন, যা শুনে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল।

​"তুমি কি জানো, সর্বকালের সেরা প্রতিভাধর আলবার্ট আইনস্টাইনের আইকিউ লেভেলের কথা? অথচ নিজের সারা জীবনের অর্জিত সমস্ত সম্পদ তিনি এই স্টক মার্কেটে মাত্র তিন বছরের মধ্যে খুইয়ে ফেলেছিলেন। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান মানুষটিও এই গোলকধাঁধায় পথ হারিয়েছিলেন। কেন? কারণ স্টক মার্কেটে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয় না।"

​আমি বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কাকু এবার সেই মন্ত্রটি উচ্চারণ করলেন যা সারাজীবন আমার কানে প্রতিধ্বনিত হবে:

​"স্টক মার্কেটে বুদ্ধিমত্তা নয়, প্রয়োজন হয় 'প্রজ্ঞা' বা 'Wisdom'। বুদ্ধিমত্তা আর প্রজ্ঞার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত আছে। মনে রেখো, বুদ্ধিমান লোকেরা চিরকাল জ্ঞানী বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের অধীনে কাজ করে এসেছে। বাজারের ময়দানে সেই মানুষটিই জেতে, যে নিজের বুদ্ধির দম্ভ বিসর্জন দিয়ে প্রজ্ঞার হাত ধরে ধৈর্য্য ধরে বসে থাকতে জানে।"


ডিগ্রির দেয়াল ভেঙে প্রজ্ঞা অর্জন

​আমি ডায়েরির পাতা থেকে মুখ তুলে কাকুর দিকে তাকালাম। রাতের নিস্তব্ধতায় তাঁর প্রতিটি কথা যেন আমার মগজের কোষে কোষে এক নতুন চেতনার জন্ম দিচ্ছিল।

কাকু তাঁর ল্যাম্পের আলোটা আর একটু কমিয়ে দিলেন। ঘরের ছায়াগুলো যেন আরও দীর্ঘ হয়ে উঠল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম তাঁর কথাগুলো - বুদ্ধিমান আর জ্ঞানীর সেই চিরকালীন লড়াইয়ের উপাখ্যান।

​তিনি বলতে শুরু করলেন, "অপূর্ব, বুদ্ধিমানরা চিরকালই জ্ঞানী বা প্রজ্ঞাবান মানুষদের অধীনে কাজ করে এসেছে। একটা জীবন্ত উদাহরণ দিই তোমাকে। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর কথা ভাবো। দু-দুবার তিনি একটি বিশাল রাজ্যের শাসনভার সামলেছেন। এখন তুমিই বলো, আমরা তাঁকে কতটা 'বুদ্ধিমান' বা তথাকথিত শিক্ষিত মনে করি? তিনি কি খুব ভালো কম্পিউটার চালাতে পারেন? ঝরঝরে ইংরেজি বলতে পারেন? কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি, আরবিআই-এর জটিল মারপ্যাঁচ বা কোনো কোম্পানির ব্যালেন্স শিট বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাঁর কতটা আছে বলে তুমি মনে করো?"

​আমি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই কাকু নিজের হাতেই একটা বড় শূন্য আঁকলেন বাতাসে। "আমি বলছি, ওসব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান হয়তো শূন্যের কোঠায়। অথচ দেখো, দেশের বাঘা বাঘা সব আইএএস (IAS) অফিসাররা, যারা কিনা ভারতের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রখর বুদ্ধিমান ব্যক্তিত্ব, তাঁরা সবাই কার নির্দেশে কাজ করতেন? ওই মায়াবতীর অধীনে। কেন এমন হয় জানো? কারণ পুরো বিশ্ব আর পুরো জীবনটা ঠিক এই নিয়মেই চলে।"


ভিড়ের উল্টো পথে চলুন (গেটস, আম্বানি)

​কাকুর কণ্ঠস্বরে এবার একটা করুণ সুর বেজে উঠল। "বুদ্ধিমান লোকেরা সারাজীবন শুধু একটা জিনিস নিয়েই বুঁদ হয়ে থাকে - আমার এই বিশাল ডিগ্রি আছে, আমার ওই নামী প্রতিষ্ঠানের তকমা আছে। কিন্তু, এই ডিগ্রি তোমাকে একটা নির্দিষ্ট স্তরের উপরে আর কিছুই দিতে পারবে না। হ্যাঁ, তুমি যদি টিসিএস বা ইনফোসিসের ডিরেক্টর হও, কিংবা কোনো নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজার হও, তবে তুমি খুব আয়েশি আর সুন্দর একটা জীবন কাটাতে পারবে। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তুমি কি সেই ডিগ্রি দিয়ে ১০০ কোটি, ২০০ কোটি বা ৫০০ কোটির সাম্রাজ্য গড়তে পারবে? পারবে না।"

​আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "কেন পারব না কাকু?"

​কাকু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলেন। "কারণ ওই ডিগ্রিগুলো তোমার চারপাশে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দেয়। ওগুলো তোমার জন্য একটা 'কমফোর্ট জোন' বা স্বাচ্ছন্দ্যের ঘেরাটোপ তৈরি করে। সেই ঘেরাটোপটা কেমন জানো? ওটা তোমাকে বোঝায় যে তুমি অনেক বড় কিছু হয়ে গেছ, তোমার আর নতুন করে শেখার কিছু নেই। এই মেকি আভিজাত্যই তোমাকে প্রকৃত প্রজ্ঞার পথে এগোতে বাধা দেয়। এই স্বাচ্ছন্দ্যের জেলখানায় বন্দি হয়েই বুদ্ধিমানরা সারাজীবন অন্যের হয়ে কাজ করে যায়, আর প্রজ্ঞাবান মানুষরা কোনো বড় ডিগ্রি ছাড়াই সাম্রাজ্য শাসন করে যায়।"

​আমি ডায়েরির পাতায় কাকুর এই কথাগুলো টুকে নিতে নিতে ভাবছিলাম - আমি কি তবে এতদিন আমার অর্জিত শিক্ষার অহংকারেই বন্দি ছিলাম?

কাকু তাঁর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। রাতের নিস্তব্ধতায় তাঁর কণ্ঠস্বর যেন এক গভীর সত্যের প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছিল। আমি একদৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

​তিনি বলতে শুরু করলেন, "অপূর্ব, এই ডিগ্রিগুলো আমাদের ঠিক কেমন স্বাচ্ছন্দ্যের ঘেরাটোপে আটকে রাখে জানো? ওগুলো আমাদের মনের ভেতর সারাক্ষণ একটা সুর বাজাতে থাকে - ‘আমি তো বেশ ভালোই করছি। আমার তো অনেক জ্ঞান। নতুন করে আর শেখার কী আছে?’ এই মেকি তৃপ্তি থেকেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত আলস্য। আমাদের মনে হয়, সারা সপ্তাহ হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছি, আমি তো আমার ক্লাসের টপার ছিলাম - তাই এই শনি-রবিবারটা আমার শুধুই নেটফ্লিক্স দেখে আর ঘুরে বেড়িয়ে উপভোগ করার জন্য। কিন্তু একটা নির্মম সত্যি শোনো অপূর্ব - টপার হওয়া বা বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করা তোমাকে সম্মানজনক একটা ‘বেতন’ ছাড়া আর কিছুই দেবে না।"

​কাকু টেবিলের ওপর দুবার টোকা দিলেন, যেন আমার মনোযোগ কেড়ে নিতে চাইলেন।

​"এই নির্দিষ্ট ডিগ্রিগুলো তোমাকে বড়জোর প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধি এনে দেবে। হাজারে একটা আধটা ব্যতিক্রম ছাড়া কারোরই ভাগ্য ওতে আকাশছোঁয়া হয় না। তাই তুমি যদি সত্যিই একটা স্তরের উপরে উঠতে চাও, তবে সবার আগে এই দম্ভটা বিসর্জন দিতে হবে যে - ‘আমি খুব স্মার্ট’ বা ‘আমি খুব বুদ্ধিমান’। তোমাকে শুধু একটা লক্ষ্য মনে গেঁথে নিতে হবে - আমাকে সম্পদ তৈরি করতে হবে। আমাকে টাকাকে সম্মান করতে হবে এবং শিখতে হবে কীভাবে সেই টাকা আরও বৃদ্ধি করা যায়।"

​কাকু জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করলেন, "এই পৃথিবীর বড় বড় শিল্পপতিদের দিকে একবার নজর দাও তো! যে সব কারখানার টার্নওভার একশো কোটির বেশি আর নিট মুনাফা দশ কোটির ওপর - খুঁজলে দেখবে সেই সব কোম্পানির মালিকদের সত্তর থেকে আশি শতাংশ মানুষ কলেজের গণ্ডিই পেরোননি। তাঁরা কোনো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট নন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় কী জানো? এই সব মানুষদের অধীনেই কাজ করে ঝানু সব পিএইচডি হোল্ডার, আইআইটি বা আইআইএম-এর প্রখর মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা, এমনকি বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসা বড় বড় বিশেষজ্ঞরা।"

কাকু তাঁর চেয়ারটা একটু এগিয়ে নিয়ে এলেন। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় তাঁর মুখচ্ছবিতে এক অটল কাঠিন্য ফুটে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন:

​"অপূর্ব, এই যে আমি বললাম উচ্চশিক্ষা আর বড় সম্পদ অর্জনের মধ্যে কোনো চিরস্থায়ী সম্পর্ক নেই, তা কি শুধু আমার মুখের কথা? ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই দেখবে, পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দেওয়া মানুষগুলোর অনেকেই কিন্তু প্রথাগত শিক্ষার সীমানায় আটকে থাকতে পারেননি।

​ভাবো একবার বিল গেটস বা স্টিভ জবস-এর কথা। এঁরা দুজনেই ছিলেন ‘কলেজ ড্রপআউট’। হার্ভার্ড বা রিড কলেজের মতো নামী প্রতিষ্ঠানের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে তাঁরা যখন বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন সবাই তাঁদের উন্মাদ ভেবেছিল। কিন্তু তাঁরা জানতেন, পাঠ্যবইয়ের পাতায় যা শেখানো হয়, জীবনের আসল লড়াইতে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন হয় অদম্য জেদ আর প্রজ্ঞার। আজ তাঁদের তৈরি করা মাইক্রোসফট কিংবা অ্যাপল-এ বিশ্বের তাবড় তাবড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা পিএইচডি হোল্ডাররা কাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।

​এমনকি আমাদের দেশের দিকে তাকালেও দেখবে, ধীরুভাই আম্বানির মতো কিংবদন্তি মানুষটি কোনোদিন কলেজের বারান্দা মাড়াননি। কিন্তু তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছে এক বিশাল সাম্রাজ্য। কেন এমনটা হয় জানো? কারণ, তাঁরা বুঝেছিলেন ভিড় যেদিকে ছুটছে, সেই একই রাস্তায় হেঁটে কোনোদিন প্রথম হওয়া যায় না।

​আসল জেদটা ছিল তাঁদের নিজেদের ওপর। তাঁরা জানতেন, ডিগ্রি হয়তো তোমাকে একটা সম্মানজনক চাকরি এনে দেবে, কিন্তু পৃথিবী শাসন করার জন্য প্রয়োজন হয় - ভিড় থেকে আলাদা চলার সাহস আর টাকাকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল। মনে রেখো অপূর্ব, ৯৯ শতাংশ লোক যখন একদিকে ছোটে, তখন ওই ১ শতাংশ মানুষ উল্টো দিকে হেঁটে ইতিহাস তৈরি করে।"

​আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তবে কি পুথিগত বিদ্যার কোনো দাম নেই কাকু?"

​কাকু মৃদু হাসলেন। "দাম আছে, কিন্তু তা দিয়ে মালিক হওয়া যায় না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ এটা নয় যে তুমি কটা বই গোগ্রাসে গিলেছ। এখানে আসল শিক্ষা হলো - টাকা আসলে কী? কীভাবে তাকে নিজের আয়ত্তে আনতে হয়? নিজের অবাধ্য আবেগকে কীভাবে শিকলে বেঁধে রাখা যায়? আর সবশেষে - এই বিশাল জনসমুদ্র বা ‘ভিড়’ যেদিকে ছুটছে, তার ঠিক বিপরীত দিকে হাঁটার সাহস সঞ্চয় করা।"

​কাকু আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অমোঘ সত্যিটা উচ্চারণ করলেন, "অপূর্ব, ভিড় থেকে আলাদা চলাটাই হলো আসল জয়। কারণ, যখনই তুমি দেখবে ওই ৯৯ শতাংশ মানুষ একই গর্তে গিয়ে পড়ছে, তখনই তোমাকে বুঝতে হবে যে সফল হতে গেলে তোমাকে ওই ভিড়ের স্রোত থেকে নিজেকে ছিঁড়ে বের করে আনতে হবে।"

​আমি ডায়েরিটা বন্ধ করে কাকুর দিকে তাকালাম। আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হয়েছে। আমার এতো বছরের অর্জিত শিক্ষার অহংকার যেন কাকুর কথার ঝড়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।


১% এর গোপন কৌশল: ভয়ের খেলাকার

কাকু তাঁর চেয়ারটা আমার একটু কাছে টেনে আনলেন। গলার স্বরটা নামিয়ে আনলেন একদম নিচু পর্দায়, যেন কোনো গোপন রাজকীয় ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করছেন।

​তিনি বলতে শুরু করলেন, "অপূর্ব, তুমি হয়তো মনে মনে ভাবছো, ৯৯ শতাংশ লোক কি ভুল হতে পারে? সবাই যখন ভয়ে কাঁপছে, চারদিকে হাহাকার, তখন এতগুলো মানুষের ধারণা কি মিথ্যে হতে পারে? সবাই তো ভুল হতে পারে না!"

​কাকু একটু থামলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। "এইখানেই আসল খেলা। তোমাকে সবার আগে বুঝতে হবে, এই ভয়টা দেখাচ্ছে কে? এই আতঙ্কের কারিগর কারা? এরা হলো সেই ১ শতাংশ মানুষ, যারা এই বাজারে শেষ হাসি হাসে। কারণ, ওই মুষ্টিমেয় ১ শতাংশ মানুষকে যদি জিততে হয়, তবে বাকি ৯৯ শতাংশকে ভয় দেখানো ছাড়া তাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই। তাদের পকেট ভরতে গেলে তোমার মনে ভয় ঢুকিয়ে তোমাকে দিয়ে ভুল করানোটাই তাদের ব্যবসার মূল মন্ত্র। এখানে কোনো বিকল্প নেই।"

​কাকু ডায়েরির ওপর রাখা আমার হাতটার ওপর নিজের হাত রাখলেন। "সুতরাং, আমাদের বুদ্ধিমান নয়, জ্ঞানী হতে হবে। তোমার পুঁথিগত বুদ্ধিমত্তাকে একপাশে সরিয়ে রাখো। ওটা দিয়ে তুমি তোমার অফিস চালাও, ব্যবসা সামলাও, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু খবরদার! স্টক মার্কেটের আঙিনায় ওই বুদ্ধির দম্ভ নিয়ে এসো না। যদি আনো, তবে বাজার তোমাকে এমন মার মারবে যে সামলাতে পারবে না। কারণ, স্টক মার্কেট অহংকারী বা জেদি লোকদের সহ্য কিরতে পারে না।"


বিনয়ী হোন, জেদ ত্যাগ করুন

​আমি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কাকু আবার বললেন, "এই বাজারে শুধু দুই ধরণের লোক টিকে থাকে। 

এক - যারা স্বভাবজাত ভাবেই বিনয়ী।

আর দুই - যারা বাজারের মার খাওয়ার পরে বিনয়ী হয়ে গিয়েছে।

যদি তোমার ভেতর বিনয় না আসে, যদি নিজেকে ছোট মনে করে বাজারে চলতে না পারো, তবে এই বাজার তোমাকে এক পয়সাও দেবে না। নিজের জেদ চালানো এখানে বন্ধ করতে হবে।"

​আমি একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "বিনয়ী হওয়া মানে কি সব সময় মেনে নেওয়া?"

​"একদম তাই," কাকু উত্তর দিলেন। "বিনয়ী হওয়ার মানে হলো - তুমি যা আশা করেছিলে, বাজার যদি তার ঠিক উল্টোটা করে, তবে মাথা নত করে সেটা মেনে নেওয়া। কোনো তর্ক না করা, কোনো জেদ না দেখানো। স্রেফ এই সহজ সত্যিটা উপলব্ধি করা যে - বাজার এভাবেই চলে। নিজের তাত্ত্বিক জ্ঞান আর বুদ্ধির ঝুলিটাকে একপাশে সরিয়ে রাখাই হলো আসল বিনয়। কেন জানো? কারণটা বড় অদ্ভুত অপূর্ব। আমি এই পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কোনো বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদকে ‘বিলিওনিয়ার’ হতে দেখিনি।"

​কাকুর শেষ কথাটায় আমি চমকে উঠলাম। তাত্ত্বিক বিদ্যার পাহাড় নিয়েও যারা বিলিওনিয়ার হতে পারেন না, তাদের ব্যর্থতার কারণটা সেই মুহূর্তে আমার কাছে পরিষ্কার হতে শুরু করল।


অর্থনীতিবিদ কেন বিলিয়নিয়ার হয় না?

কাকুর কণ্ঠস্বর যেন এবার এক অমোঘ সত্যের চাবুক হয়ে নেমে এল। তিনি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, "অপূর্ব, আমার কথাগুলো কি তোমার মগজে ঢুকছে? তুমি বিলিওনিয়ারদের সারা বিশ্বের যত তালিকা আছে, সব বের করে দেখো। একজনও কি পাবে যে পেশায় একজন অর্থনীতিবিদ? একজনও নয়!"

​কাকু একটু থামলেন, যেন আমার উত্তরের অপেক্ষা করছেন। তারপর নিজেই ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন, "অর্থনীতিবিদকে আমরা বলি 'অর্থ-শাস্ত্রী'। শাস্ত্রী মানে যিনি শাস্ত্রের অগাধ জ্ঞান রাখেন। আর 'অর্থ'? 'অর্থ'-এর মানে হলো টাকা, মানি, ধন-সম্পদ। আশ্চর্যের বিষয় হলো - যারা এই ধনের বিষয়ে বিশ্বসেরা পণ্ডিত, তারাই বাস্তবে টাকা কামাতে পারছেন না।"

​আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "কিন্তু কেন কাকু? বিদ্যা যার আছে, সিদ্ধি তো তারই হওয়ার কথা!"

​কাকু ম্লান হাসলেন। "কারণ তাদের ওই বিশাল ডিগ্রির অহংকার। সেই অহংকারই তাদের সামনে এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে দেয়। ওই ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটের ভারে তারা এতোটাই নুইয়ে পড়ে যে, তাদের সেই জ্ঞানকে ব্যবহারিকভাবে বা 'প্র্যাকটিক্যালি' প্রয়োগ করার সাহস বা সুযোগ - কোনোটিই থাকে না। একটি কথা খুব মন দিয়ে বোঝো অপূর্ব - একজন পিএইচডি হোল্ডার বা বড় একাডেমিক বিশেষজ্ঞ কোথায় তৈরি হয়? কোনো কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাই তো? কোনো কলকারখানায় কি পিএইচডি তৈরি হয়?"

​আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

কাকু বলতে লাগলেন, "একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শেখানো হয় শুধু তত্ত্ব বা 'থিওরি'। সেখানে ব্যবহারিক জীবনের রুক্ষ মাটির কোনো স্থান নেই। কেন নেই জানো? কারণ সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা শেখাচ্ছেন, তারা নিজেরাও তো একেকজন 'এমপ্লয়ী' বা কর্মচারী। প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সেখানে বসে লেকচার দেন না। একজন কর্মচারী কোনোদিনও তোমাকে মালিক হওয়ার মন্ত্র শেখাতে পারবে না।"


আপনি কি ১% এর জন্য প্রস্তুত?

​ঘরের আলোটা এবার আরও ম্লান হয়ে এল। কাকু তাঁর ডায়েরিটা বন্ধ করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "অপূর্ব, আজকের মতো এইটুকুই থাক। মনে রেখো, আমরা যদি ১ শতাংশের তালিকায় নাম লেখাতে চাই, তবে আমাদের ওই পুথিগত বিদ্যার কর্মচারীদের মতো ভাবলে চলবে না। আমাদের শিখতে হবে সেই ব্যবহারিক প্রজ্ঞা, যা কোনো ডিগ্রি দেয় না, দেয় শুধু জীবন আর এই কঠিন বাজার।"

​আমি ডায়েরিটা গুছিয়ে নিলাম। কাকুর কথাগুলো আমার মস্তিষ্কে এক নতুন চেতনার ঢেউ তুলে দিয়েছে। বুঝতে পারলাম, 'ডলার কাকুর ডায়েরি'র এই প্রথম পাঠ আমার সারাজীবনের অর্জিত শিক্ষাকে আজ এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

সেদিন জমিদার বাড়ি থেকে ফেরার পথে পাহাড়ি অন্ধকার নেমে এসেছিল। কিন্তু আমার ভেতরে যেন নতুন আলো জ্বলে উঠেছিল। আমি বুঝেছিলাম, বাজারকে হারানোর আগে নিজেকে জয় করতে হবে।

আপনি কি আপনার ডিগ্রির অহংকার ছেড়ে বাজারের সামনে বিনয়ী হতে প্রস্তুত? 
আপনার জীবনে কি শৃঙ্খলার অভাবে কখনো বিনিয়োগে ক্ষতি হয়েছে? কমেন্টে আমাদের জানান।

কাকু একটু থামলেন। চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে চেয়ে বললেন, 'অপূর্ব, শুধু নিয়ম মেনে বিনিয়োগ করলেই হবে না, সেই নিয়ম ভাঙার প্রলোভনকে জয় করাই হলো আসল যুদ্ধ।'—কী সেই প্রলোভন? আর কীভাবে ডলার কাকু সেই যুদ্ধে জয়ী হলেন? জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে...


ভাস্কর বসু | মাইকেলনগর, কোলকাতা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন